বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল পরিসরে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক আলোচনা, সামাজিক বিতর্ক, বাণিজ্যিক প্রচারণা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ—সব ক্ষেত্রেই অনলাইন কার্যক্রমের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এরই মধ্যে "বটবাহিনী" বা সমন্বিত স্বয়ংক্রিয় ও ভুয়া অ্যাকাউন্টের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেন, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের একটি বড় অংশ বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপ থেকে আসে। তার মতে, অনলাইনের প্রতিক্রিয়া ও জনমত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অর্গানিক এবং নন-অর্গানিক ট্রাফিক আলাদা করে দেখা না হলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তিগত ভাষায় বট (Bot) হলো এমন একটি সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বট ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মন্তব্য, লাইক, শেয়ার কিংবা প্রতিক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে প্রচারণা চালাতেও ব্যবহৃত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বট কার্যক্রম সাধারণত দুইভাবে পরিচালিত হয়। প্রথমটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারনির্ভর, যেখানে পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কী-ওয়ার্ড বা ঘটনার পরপরই প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়। দ্বিতীয়টি মানুষের নিয়ন্ত্রিত একাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যাকে অনেক সময় ট্রল আর্মি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য থাকে জনমতকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমন্বিতভাবে একই ধরনের মন্তব্য, অভিন্ন ভাষা বা একই ধরনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে সেটি বাস্তব জনমতের প্রতিফলন বলে মনে হতে পারে। যোগাযোগ ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় এ ধরনের ঘটনাকে "Bandwagon Effect" এবং "Astroturfing" নামে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, যাতে সেটি স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন বলে মনে হয়।
এ ধরনের কার্যক্রমের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু রাজনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করা, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, সমন্বিতভাবে কোনো অ্যাকাউন্ট রিপোর্ট করে সাময়িকভাবে বন্ধ করিয়ে দেওয়া কিংবা ডিপফেক কনটেন্টকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বট ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুবার উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে আধুনিক বটগুলো আগের তুলনায় আরও বাস্তবসম্মত ভাষায় মন্তব্য করতে পারে। ফলে প্রকৃত ব্যবহারকারী এবং স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে সব দ্রুত মন্তব্য বা একই ধরনের প্রতিক্রিয়া যে বটের মাধ্যমেই আসে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সঠিক নয়। কোনো বিষয় নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত জনআগ্রহ, সমর্থকদের সমন্বিত প্রচারণা অথবা অ্যালগরিদমিক কারণে একই ধরনের কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেও পারে। তাই বট কার্যক্রম শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, তথ্য যাচাই এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় ভাষা ও প্রেক্ষাপট বোঝার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital Literacy) বৃদ্ধি, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা, ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি এবং সংঘবদ্ধ অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তাই কৃত্রিম জনমত, ভুয়া তথ্য এবং সমন্বিত ডিজিটাল অপপ্রচার—এসব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাস্তবতা যাচাই করা এখন সময়ের দাবি।
কসমিক ডেস্ক