বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং পর্যটন খাতে নতুন গতি আনতে ২০০৬ সালের বিদ্যমান ভিসা নীতিমালার পরিবর্তে ভিসানীতি-২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে বিদেশিদের বাংলাদেশে আগমন ও প্রস্থান আরও সহজ, সুশৃঙ্খল এবং সেবামুখী করার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং পারস্পরিকতার ভিত্তিতে আধুনিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন ভিসানীতি-২০২৬-এর খসড়া উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খসড়াটি আরও পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। একই বিষয়ে পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভিসানীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশ ও প্রস্থান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং কার্যকর করা। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করা, পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পারস্পরিকতার নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা পরিচালনার বিষয়গুলোও নতুন নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো একটি আধুনিক, কার্যকর ও সেবামুখী অভিবাসন কাঠামো গড়ে তোলা, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
নাসিমুল গনি বলেন, অতীতে পারস্পরিকতার ভিত্তিতেই মূলত ভিসা নীতিমালা পরিচালিত হতো। অর্থাৎ, কোনো দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য যে ধরনের সুবিধা দিত, বাংলাদেশও সেই দেশের নাগরিকদের একই ধরনের সুবিধা প্রদান করত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই ধারণায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আসা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তারা নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি নিয়ে আসতে পারেন। এ কারণেই সরকার এখন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আরও বাস্তবমুখী ভিসা নীতি প্রণয়ন করতে চায়।
তিনি আরও জানান, নতুন ভিসানীতিতে মোট ৩৪টি ভিসা ক্যাটাগরি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি ক্যাটাগরির বিস্তারিত শর্ত, মেয়াদ এবং প্রক্রিয়া পরিমার্জন শেষে চূড়ান্ত নীতিমালায় প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন ভিসানীতি কার্যকর হলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্প্রসারণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, দক্ষ বিদেশি পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া আধুনিক ও ডিজিটাল অভিবাসন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভিসা আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং ব্যবহারবান্ধব করার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখেই বিদেশি নাগরিকদের জন্য আরও কার্যকর ভিসা সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়োপযোগী ভিসানীতি-২০২৬ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, পর্যটন খাত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি দেশের অভিবাসন ব্যবস্থাও আধুনিক, সেবামুখী ও বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামোয় রূপ নেবে।
কসমিক ডেস্ক