ধান, নদী আর খাল—এই তিনের সম্মিলনেই বরিশালের পরিচয়। এই ভূখণ্ডের প্রতিটি প্রান্ত জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদী-খালে বাঁধা। সেই নদীগুলোর মধ্যে বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদী এক অনন্য নাম, যা কেবল জলধারা নয়—হাজারো মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বরিশাল জেলার এই প্রধান নদীটির উৎপত্তি আড়িয়াল খাঁ নদী থেকে। এরপর এটি প্রবাহিত হয়ে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার কঁচা নদীতে গিয়ে মিশেছে। বানারীপাড়া ও স্বরূপকাঠি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ মাইল দীর্ঘ অংশ জুড়ে বয়ে চলা সন্ধ্যা নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৬১ কিলোমিটার।
এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এলাকার অর্থনীতি। সন্ধ্যা নদীর ইলিশ সারা দেশে পরিচিত ও জনপ্রিয়। মাছ আহরণ, নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই নদীই বহু মানুষের একমাত্র ভরসা। নদী ছাড়া যেন এখানকার জীবন কল্পনাই করা যায় না।
প্রতি সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার সন্ধ্যা নদীতে বসে ভাসমান ধান-চালের হাট। নৌকার ওপর গড়ে ওঠা এই হাটে চলে বেচাকেনা, দরকষাকষি আর মানুষের কোলাহল। নদীকে কেন্দ্র করে ধান-চালের কুঠিয়াল ব্যবসা বহুদিনের ঐতিহ্য। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি লঞ্চ যোগাযোগ থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের শস্য পরিবহনে এই নদীপথ যুগের পর যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলার শস্যভান্ডার খ্যাত বরিশালের ধান ও চাল রাজধানীতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নদী যেন নীরব বাহক।
সন্ধ্যা নদী শুধু অর্থনীতির নয়, সাহিত্য ও স্মৃতিরও অংশ। কবি শঙ্খ ঘোষের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিতে এই নদী গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কলকাতায় বসেও তিনি সন্ধ্যা নদীর তীরে ফিরে যাওয়ার কথা বলতেন। নদীর মায়াবী সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি রচনা করেছিলেন ‘সন্ধ্যা নদীর জলে’—যা নদীটির প্রতি তার গভীর ভালোবাসার সাক্ষ্য।
এই নদীতেই বাস করে মানতা সম্প্রদায়—যাদের জীবন পুরোপুরি নদীনির্ভর। নৌকাই তাদের ঘর, সংসার, জন্ম ও মৃত্যু। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা নদীতে ভেসে মাছ ধরে জীবন কাটায়। নিজস্ব ভূমি না থাকায় মৃত্যুর পর অনেক ক্ষেত্রে তাদের দেহ নদীতেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়—যেন নদীই তাদের শেষ আশ্রয়।
সন্ধ্যা নদীর রয়েছে মানুষকে মুগ্ধ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা। নদীতীরের ‘মিনি কুয়াকাটা’ নামে পরিচিত বাইপাস সড়কে গোধূলি লগ্নে সূর্যাস্ত দেখতে ভিড় করে অসংখ্য মানুষ। নদীর জলে রাঙা সূর্যের আলো, বাতাসের শীতল ছোঁয়া আর নীরব প্রবাহ—সব মিলিয়ে এক মোহময় দৃশ্য।
এক সময় শত শত মাঝির খেয়া নৌকা আর পালতোলা নৌকায় মুখর থাকত সন্ধ্যা নদী। কালের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবু নদীটি আজও বহমান—জীবন, জীবিকা, স্মৃতি আর সৌন্দর্যের গল্প বয়ে নিয়ে।
সন্ধ্যা নদী তাই শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি বরিশালের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক মায়াবী বাস্তবতা।