বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’ প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সংগীত ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি, কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপাসহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক গুণীজন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পী অনুপমা মুক্তি ফেরদৌসী রহমানের জনপ্রিয় দুটি গান ‘লোকে বলে প্রেম’ এবং ‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’ পরিবেশন করেন।
নিজের জনপ্রিয় গান ‘লোকে বলে প্রেম’-এর চরণ থেকেই আত্মজীবনীর নামকরণ করেছেন ফেরদৌসী রহমান। বইয়ের নামের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সংগীতই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেম। আর সেই প্রেমকে ধরে রাখতে আজীবন যে সাধনা, ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে, সেটিকেই তিনি ‘জ্বালা’ হিসেবে দেখেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ফেরদৌসী রহমান বলেন, তিনি নিজের অর্জনের গল্পের চেয়ে মানুষের গল্পকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বইটিতে পুরনো ঢাকার পরিবেশ, বিলুপ্তপ্রায় নানা আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খাবার, সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অনেক বিষয় স্থান পেয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্যও মূল্যবান হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের সহশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাদের পরিচয়। পরে ১৯৬৫ সালে ‘ডাকবাবু’ চলচ্চিত্রে প্রথমবার দ্বৈত কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তিনি বলেন, পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর কন্যা হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই উপমহাদেশের খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন ফেরদৌসী রহমান, যা তাঁর শিল্পীজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।
কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা ফেরদৌসী রহমানকে বাংলা সংগীতের ‘হিমালয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, আধুনিক গান, নজরুলসংগীত, ধ্রুপদী ও পল্লীগীতিসহ বিভিন্ন ধারার সংগীতে তাঁর সমান দক্ষতা উপমহাদেশে বিরল।
১৯৪১ সালের ২৮ জুন ভারতের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী রহমান। বাবার কাছেই সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে তাঁর প্রথম গান প্রচারিত হয়। দেশভাগের পর পরিবারসহ ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরবর্তী সময়ে প্রায় ২৫০টি চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানেও গান পরিবেশন করেন তিনি।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, রাশিয়া ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা গান পরিবেশন করে বাংলাদেশের সংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করেছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত এই শিল্পীর আত্মজীবনী তাঁর সংগীতজীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক মূল্যবান দলিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক