শত বছরেরও বেশি সময় ধরে মুম্বাই শহরের চাকুরিজীবীদের ঘরে তৈরি গরম খাবার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে আসছেন ডাব্বাওয়ালারা। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়—কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তাদের সময়নিষ্ঠ ও নির্ভুল ডেলিভারি ব্যবস্থা। কিন্তু আধুনিক যুগের পরিবর্তন, প্রযুক্তির বিস্তার এবং জীবনযাত্রার রূপান্তরের কারণে আজ সেই ঐতিহ্যবাহী পেশা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া এই ডাব্বাওয়ালা ব্যবস্থা মুম্বাইয়ের লজিস্টিকস ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো আধুনিক প্রযুক্তি, জিপিএস বা ডিজিটাল অ্যাপ ছাড়াই শুধুমাত্র আলফানিউমেরিক কোড ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার টিফিন সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিতেন তারা। তাদের এই নিখুঁত সিস্টেম নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গবেষণা হয়েছে, এমনকি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল পর্যন্ত এই মডেলকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে সময়ের সাথে সাথে এই ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে যেখানে মুম্বাইয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার নিবন্ধিত ডাব্বাওয়ালা ছিলেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় দেড় হাজারে নেমে এসেছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে করোনা মহামারি। লকডাউনের সময় অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডেলিভারির চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়। পরবর্তীতে অনেক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা হাইব্রিড মডেল চালু করায় প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার প্রবণতা আগের মতো আর নেই।
এছাড়া জোমাটো ও সুইগির মতো অনলাইন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম এবং ক্লাউড কিচেনের দ্রুত বিস্তারও ডাব্বাওয়ালাদের ব্যবসায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। এক সময় কম খরচে নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়া এই পেশাটি এখন প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থার সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
ফলে অনেক ডাব্বাওয়ালা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। কেউ অটো রিকশা চালাচ্ছেন, আবার কেউ পারিবারিক খরচ মেটাতে একাধিক কাজ করছেন। দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখার চেষ্টা চললেও আয়ের সংকট তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের মতো পূর্ণাঙ্গ সেবা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা টিকে থাকার জন্য শিফটভিত্তিক কাজের পরিকল্পনা করছে, যাতে সদস্যরা অন্য কাজের সুযোগও পেতে পারেন।
তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের এই গতির সামনে ডাব্বাওয়ালা ব্যবস্থা কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে এখন গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একসময় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত এই অনন্য লজিস্টিকস সিস্টেম হয়তো ভবিষ্যতে কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
কসমিক ডেস্ক