সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে পাকা বোরো ধান তলিয়ে গিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। জেলার ১২টি উপজেলার অধিকাংশ হাওরে একই ধরনের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে—কোথাও কাটা ধান পানিতে ভেসে যাচ্ছে, আবার কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ধান সম্পূর্ণভাবে পানির নিচে চলে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে জেলায় ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সুরমা নদীসহ জেলার সব প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দিয়েছে। কুশিয়ারা, বৌলাই, যাদুকাটা, পাটলাইসহ বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন সুনামগঞ্জে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাতের কারণে উজান থেকে নেমে আসা ঢল পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
হাওরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা জানান, তারা মাঠে নেমে কোনোভাবে ধান কাটার চেষ্টা করছেন, কিন্তু শ্রমিক সংকট ও অবিরাম বৃষ্টির কারণে কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক জায়গায় কেটে রাখা ধানও পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কালিয়াকোটা হাওরপাড়ের কৃষক সাজিবুর রহমান বলেন, তারা স্থানীয়ভাবে বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে সেই বাঁধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি প্রশাসনের জরুরি সহায়তা দাবি করেন।
ভরাম হাওরের কৃষক বাবুল দাস জানান, চোখের সামনে পাকা ধান পানির নিচে চলে যাচ্ছে। কাটা ধান শুকাতে না পেরে সব নষ্ট হচ্ছে। তার ভাষায়, “এখন ভগবানই ভরসা।”
চাপতির হাওরের কৃষক আফরোজ মিয়া বলেন, কয়েকদিন আগেও মাঠে সোনালী ধান ছিল, এখন শুধু পানি। এতে তাদের সংসার চালানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে এলাকায় ছুটে যান। তিনি বলেন, হাওরের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ধানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফসল নষ্ট হলে তাদের পুরো বছরের পরিকল্পনা ভেঙে যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে বাকি অংশ এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। টানা বৃষ্টি চলতে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক কৃষক কাটা ধান ঠিকভাবে শুকাতে পারছেন না। আর্দ্রতা বেশি থাকায় ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অটোরাইস মিল ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচা ধান শুকানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তারা কৃষকদের সতর্ক করে বলেছেন, ভেজা ধান বস্তাবন্দি করে রাখা হলে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই ধান খোলা ও শুকনো জায়গায় ছড়িয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে নদী ও খাল খননের ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণের বদলে জলপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত না করলে এই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, শ্রমিক সংকট এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা—সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কৃষকের ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক