বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে জর্জ বার্নার্ড শ এমন এক কিংবদন্তি, যিনি নাটককে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ এবং প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধকে প্রশ্ন করার সাহস তাঁকে নাট্যসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্মগ্রহণ করেন জর্জ বার্নার্ড শ। শৈশবে নানা আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই সাহিত্যিক ১৮৭৬ সালে লন্ডনে পাড়ি জমান। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যজীবনের নতুন অধ্যায়। ধীরে ধীরে তিনি বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী নাট্যকার ও সমাজচিন্তকে পরিণত হন।
জীবদ্দশায় তিনি ৬০টিরও বেশি নাটক রচনা করেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত নাটক ‘পিগম্যালিয়ন’ (Pygmalion), যা পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত মিউজিক্যাল ‘মাই ফেয়ার লেডি’ (My Fair Lady)-এর অনুপ্রেরণা হয়। এছাড়া ‘ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান’, ‘মেজর বারবারা’, ‘সেন্ট জোয়ান’, ‘আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান’ এবং ‘ক্যান্ডিডা’-সহ অসংখ্য নাটক আজও বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চে সমান জনপ্রিয়।
বার্নার্ড শের লেখার মূল শক্তি ছিল সামাজিক বৈষম্য, মানবাধিকার, নারী-পুরুষের সমতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নির্ভীক আলোচনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য ও নাটক মানুষের চিন্তাকে বদলে দিতে পারে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সমাজতন্ত্রী ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। অহিংস সামাজিক পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করা ফ্যাবিয়ান সোসাইটি-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (LSE)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবেও তাঁর নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯২৫ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তবে পুরস্কারের অর্থ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তাঁর নাটক ‘পিগম্যালিয়ন’-এর চলচ্চিত্র রূপের চিত্রনাট্যের জন্য তিনি অস্কারও অর্জন করেন। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এবং অস্কার অর্জনের বিরল সম্মান লাভ করেন।
১৯৫০ সালের ২ নভেম্বর ৯৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। গাছ ছাঁটাই করার সময় দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর সৃষ্ট জটিলতায় কিডনি বিকল হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর সাত দশকেরও বেশি সময় পরও জর্জ বার্নার্ড শ বিশ্বসাহিত্যে সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ, তাঁর নাটক কেবল গল্প বলেনি; মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে, সমাজকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে এবং পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
কসমিক ডেস্ক