যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। এই সংকটের মধ্যেই মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল দেশটির বিভিন্ন বন্দর থেকে সরিয়ে নিয়েছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য অবরোধ কিংবা নৌপথে নতুন সংকটের আশঙ্কায় তেহরান এই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।
ব্লুমবার্গের ট্যাঙ্কার ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি সুপারট্যাঙ্কার এবং একটি সুয়েজম্যাক্স জাহাজে করে এই বিপুল পরিমাণ তেল বহন করা হচ্ছে। এসব জাহাজের মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে ওমান উপসাগরের দিকে অগ্রসর হয়েছে এবং একটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সংকেত দিয়েছে। তবে এসব তেলের ক্রেতা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই পদক্ষেপ আসে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ও রেলসেতুতে সামরিক হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর জানিয়েছেন, এসব হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সাম্প্রতিক এই হামলার ফলে দুই দেশের মধ্যে আগে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালিতে আবারও নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই নৌপথে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। চলমান উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যেই বাজারে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ৭৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ইরানের ওপর থেকে সাময়িকভাবে শিথিল করা কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। কাতার ও সৌদি আরবের কয়েকটি জাহাজে ইরানি হামলার অভিযোগের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে ইরানের লাখ লাখ ব্যারেল তেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। আইআরজিসির নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ হলে তার ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ছিল ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিরোধের বিষয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও জ্বালানি পরিবহনই দুই দেশের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
যদি এই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি—সবখানেই এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক