গত ১৭ বছরে দেশে বাস্তবায়িত ছয়টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির কর্মকর্তা নেওয়াজুল মওলা ও আশনা ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় নীতিগত অসংগতি ও দুর্নীতির প্রভাব স্পষ্ট। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, জীবাশ্ম জ্বালানিতে অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
গবেষণায় ২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময়কাল অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশে ব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। যেখানে ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ৩ সেন্ট এবং চীনে ৪ সেন্ট খরচ হয়, সেখানে বাংলাদেশে গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ সেন্ট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াট উৎপাদনে গড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। তবে গবেষণার আওতাভুক্ত ছয়টি প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রতি মেগাওয়াটে গড়ে ১৩ কোটি ৮ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এতে প্রকল্পগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৯২৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
হিসাব অনুযায়ী, এই ছয়টি প্রকল্পে মোট প্রয়োজন ছিল ৪ হাজার ৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, কিন্তু বাস্তবে ব্যয় করা হয়েছে ৬ হাজার ৯৭০ কোটি ৮ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প সরকারি জমিতে স্থাপিত হলেও ভূমি অধিগ্রহণ বা ইজারা ছাড়াই প্রতি মেগাওয়াটে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ৮ লাখ টাকা, যা অন্যান্য সৌর প্রকল্পের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাঁচটি প্রকল্পে শুধু ভূমি ক্রয় ও ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৪৯ কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ হলেও এর ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
টিআইবি জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩১টি আনসলিসিটেড নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের লেটার অব ইন্টেন্ট বাতিল করেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ১৫টিতে ইতোমধ্যে জমি কেনা ও কর প্রদানসহ অফেরতযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। চারটি প্রকল্পে বিদেশি কোম্পানির সরাসরি বিনিয়োগ রয়েছে, যার দুটিতে শতভাগ মালিকানা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব দেখা গেছে নতুন করে আহ্বান করা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৫৫টি দরপত্র প্যাকেজে। এর মধ্যে ২২টিতে মাত্র একটি করে দরপত্র পাওয়া গেছে এবং ১৩টি প্যাকেজে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্সিং স্কিম থাকলেও দীর্ঘ ও জটিল আবেদন প্রক্রিয়ার কারণে নবায়নযোগ্য খাতে এর কার্যকর ব্যবহার সীমিত।
গবেষণায় বলা হয়, দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিস্তৃত অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিনিয়োগ ঘাটতির কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৯৮০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০৩০ সালের পর থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সর্বোচ্চ ১.৪৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ও সময়ভিত্তিক অর্থায়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি।
কসমিক ডেস্ক