পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)–এ এখনো পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ঘনিষ্ঠ আমলারা বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শক এই প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব এখনো কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জয়েন্ট রিভার কমিশন (জেআরসি), ট্রান্স বাউন্ডারি রিভার, বাংলাদেশ-ভারত পানি চুক্তিসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্পর্শকাতর তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা সিইজিআইএস মূলত সরকারের একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করে। এ কারণে এখানে কর্মরত শীর্ষ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত বিশ্লেষকদের।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাবেক সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মালিক ফিদা আব্দুল্লাহ খান ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ার নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করেই এই নিয়োগ দেন। সে সময় প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ওয়াজি উল্লাহর পক্ষে হাইকোর্টের রিটের রায় থাকলেও তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মালিক ফিদা আব্দুল্লাহ খানের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার বাবা মরহুম শাহজাদা আব্দুল মালেক খান ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের শিল্প প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। নিজেও তিনি বরগুনা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন বলে জানা গেছে, যদিও তৃণমূলে সমর্থন না থাকায় দলীয় মনোনয়ন পাননি।
মন্ত্রণালয়ের এক উপ-সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, নীতিমালা অনুযায়ী সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালকের চাকরির বয়সসীমা ৬০ বছর। সে হিসেবে মালিক ফিদা আব্দুল্লাহ খানের আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাওয়ার কথা। ইতোমধ্যে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ উপ-নির্বাহী পরিচালক মো. মোস্তফা আলী ৪ জানুয়ারি অবসরে গেছেন।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, চাকরির সময় বাড়ানোর লক্ষ্যে নির্বাহী পরিচালক ও উপ-নির্বাহী পরিচালক পুরো প্রতিষ্ঠানের বয়সসীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে ফাইলও চলাচল করে, তবে উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। এরপর নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার জন্য নির্বাহী পরিচালক ভেতরে ভেতরে তদবির করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিইজিআইএস প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০২ সালে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ বছরই আওয়ামী লীগ শাসনামলের অন্তর্ভুক্ত। ওই সময় অবসরপ্রাপ্ত আওয়ামী ঘরানার আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন কর্মকর্তারা। তাদের আশঙ্কা, এমন ব্যক্তিরা বহাল থাকলে গুরুত্বপূর্ণ পানি-তথ্যের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী শোক পালন না করায় সিইজিআইএসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আব্দুল্লাহ খান বলেন, চাকরির বিধি অনুযায়ী তিনি ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যাবেন। শোক পালন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত শোক পালন করা হয়েছে, তবে কালো ব্যাজ পরার বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ওয়াজি উল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তাকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের রায় পক্ষে থাকলেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়াকে তিনি ‘চরম অবিচার’ বলে উল্লেখ করেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খোন্দকার আজিম আহমেদ জানান, নির্বাহী পরিচালক পদে নতুন নিয়োগ বা চুক্তিভিত্তিক পুনর্নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো ফাইল তার কাছে আসেনি।
কসমিক ডেস্ক