
ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের কোরিয়া জেলায় বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এক নৃশংস ঘটনায় দুটি ট্রাকের মাঝে আটকে একটি ফরচুনার এসইউভি গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে গাড়ির ভেতরে থাকা তিনজনই জীবন্ত দগ্ধ হয়ে নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বিজেপি নেতা ও সাবেক জনপদ পঞ্চায়েত সভাপতি ভারত সিং, যিনি স্থানীয়ভাবে লাল্লা সিং নামেও পরিচিত ছিলেন। ঘটনাটি মঙ্গলবার গভীর রাতে সোনহাট থানার অন্তর্গত নওগাইন গ্রামে ঘটে, যা পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, ভারত সিং ও তার সঙ্গীরা একটি ফরচুনার গাড়িতে ঘটনাস্থলে গেলে পরিকল্পিতভাবে তাদের ঘিরে ফেলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ট্রাক সামনে এবং আরেকটি ট্রাক পেছনে দাঁড় করিয়ে তাদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর গাড়িটিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, ফলে ভেতরে থাকা সবাই আটকা পড়ে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।
ঘটনায় আহত মায়াঙ্ক সিং বর্তমানে বিলাসপুরের অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার মাথা ও মুখে গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং চিকিৎসকরা তার অবস্থাকে আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন।
ঘটনার পরপরই এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন অক্ষত ত্রিপাঠি, বিশাল ত্রিপাঠি, সত্যপ্রকাশ ত্রিপাঠি ও মান্নু ত্রিপাঠি। অন্য অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মোট নয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক রয়েছে এবং তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন ও পরিবহন ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। ভারত সিংয়ের পরিবারের কাছে একটি বালু উত্তোলন চুক্তি ছিল। অন্যদিকে ত্রিপাঠি পরিবারের মালিকানাধীন ট্রাকগুলো বালু পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো।
এই বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়, নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে ওঠে। শুরুতে এটি ব্যবসায়িক বিরোধ হলেও পরে তা রাজনৈতিক প্রভাব ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সংঘাতে রূপ নেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুরেশা চৌবে জানান, ঘটনার সময় রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফরচুনার গাড়িটিকে পরিকল্পিতভাবে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
সোনহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিনোদ পাসওয়ানও নিশ্চিত করেছেন যে এটি দীর্ঘদিনের বালু উত্তোলন সংক্রান্ত বিরোধেরই ফল। অতীতেও এ নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় নেতারা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দোষীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সব মিলিয়ে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিরোধ এখন একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডে রূপ নিয়েছে, যা পুরো ছত্তিশগড় রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি।