
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে গুগল ছেড়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছেন বিশ্বখ্যাত গবেষক নোয়াম শাজির। তিনি ছিলেন গুগলের এআই প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জেমিনি এআই মডেলের অন্যতম প্রধান স্থপতি। তার এই সিদ্ধান্তকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় গুগলের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শাজির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, তিনি ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছেন এবং সেখানে একটি শক্তিশালী গবেষণা দলের সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ। তার এই ঘোষণার পরপরই প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
নোয়াম শাজিরকে আধুনিক জেনারেটিভ এআই বিপ্লবের অন্যতম ভিত্তি নির্মাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি গুগলের প্রাথমিক সময় থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০০০ সালের দিকে প্রথম ১০০ কর্মীর একজন হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি এমন গবেষণায় নেতৃত্ব দেন যা আজকের বড় ভাষা মডেল (LLM) প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ২০১৭ সালের একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্রের সহলেখক হিসেবে তিনি পরিচিত, যা পরবর্তীতে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং অন্যান্য উন্নত এআই মডেলের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রযুক্তিগত ভিত্তি আধুনিক জেনারেটিভ এআইকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
গুগলে থাকাকালীন শাজির ২০২০ সালে সহকর্মী ড্যানিয়েল ডি ফ্রেইতাসের সঙ্গে ‘মীনা’ নামে একটি কথোপকথনভিত্তিক চ্যাটবট তৈরি করেন। পরে এটি আরও উন্নত হয়ে ‘ল্যামডা’ প্রকল্পে রূপ নেয়। তবে নিরাপত্তা ও ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় গুগল সেই প্রযুক্তি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করেনি। এই সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে ২০২১ সালে তিনি প্রথমবার গুগল ত্যাগ করেন।
গুগল ছাড়ার পর তিনি নিজের উদ্যোগে Character.AI প্রতিষ্ঠা করেন, যা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরে ২০২৪ সালে একটি বড় চুক্তির মাধ্যমে—যার মূল্য ছিল প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার—তিনি আবার গুগলে ফিরে আসেন এবং Gemini (Google AI) প্রকল্পে নেতৃত্ব দেন।
তবে এবার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি আবার প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যা গুগলের অভ্যন্তরীণ এআই কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও স্যাম অল্টম্যান শাজিরের যোগদানে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ওপেনএআইয়ের শুরু থেকেই তিনি শাজিরের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলেন। তার মতে, এই যোগদান প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নকে আরও এগিয়ে নেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শাজিরের মতো একজন শীর্ষ গবেষকের ওপেনএআইয়ে যোগদান শুধুমাত্র একটি চাকরি পরিবর্তন নয়, বরং এআই নেতৃত্বের লড়াইয়ে একটি কৌশলগত পরিবর্তন। বর্তমানে ওপেনএআই, গুগল এবং অন্যান্য বড় প্রযুক্তি কোম্পানি যেমন Anthropic একই সঙ্গে প্রতিভাবান গবেষকদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
শাজিরের শিক্ষাজীবনও ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। কিশোর বয়সে তিনি আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। পরবর্তীতে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন এবং গবেষণায় অসাধারণ ফলাফল করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই খাতে এখন সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হচ্ছে প্রতিভা ও গবেষকদের দখল নিয়ে। যেখানে একদিকে সাধারণ কর্মীরা চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছেন, অন্যদিকে শীর্ষ গবেষকদের বাজারমূল্য আকাশছোঁয়া।
নোয়াম শাজিরের এই নতুন যাত্রা তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং পুরো এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।