
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত কয়েক বছরে পুনঃতফসিল বা ঋণ পুনর্গঠন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংকগুলো প্রায় ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। এতে বছরের শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। আগের বছর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতে চাপ সামাল দিতে পুনঃতফসিল একটি সাধারণ কৌশল হলেও এর দ্রুত বৃদ্ধি আর্থিক ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পুনঃতফসিল ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে ১২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকায়। নীতিগত শিথিলতা, বিশেষ সুবিধা এবং ব্যাংক বোর্ডের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুনঃতফসিল করা ঋণের একটি বড় অংশ আবারও খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩৯.৮৭ শতাংশ ঋণ পুনরায় খেলাপি হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে ঋণ নিয়মিত করার চেষ্টা করছে, তার একটি বড় অংশ স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারছে না।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্প ও তৈরি পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি পুনঃতফসিল ঋণ রয়েছে। এছাড়া বাণিজ্য, নির্মাণ এবং আমদানি খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পুনঃতফসিল স্বল্পমেয়াদে ব্যাংক ব্যালেন্স শিটে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রকৃত খেলাপি সমস্যাকে আড়াল করতে পারে। ফলে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, কঠোর মনিটরিং এবং কার্যকর পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।