
বিশ্বজুড়ে সন্তান জন্মের হার ক্রমাগত কমে যাওয়ার পেছনে নতুন একটি কারণ সামনে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার ও ডিজিটাল আসক্তি এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হতে পারে। এই গবেষণার ফলাফল ইতোমধ্যেই সামাজিক ও জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, ২০০৭ সালটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সময়। এই বছরেই বাজারে আসে প্রথম আইফোন, যা স্মার্টফোন বিপ্লবের সূচনা করে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দাও শুরু হয়। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, অর্থনীতি স্বাভাবিক হলে জন্মহার আবার বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক উন্নতি সত্ত্বেও জন্মহার আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।
মিডলবেরি কলেজ ও ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের অর্থনীতিবিদ ক্যাটলিন মায়ার্সের মতে, স্মার্টফোনের আগমন মানুষের জীবনযাত্রা ও সম্পর্কের ধরনে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। গবেষণার প্রধান পর্যবেক্ষক এজেকিয়েল হুপার জানান, বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক সম্পর্ক এখন অনেকটাই ভার্চুয়াল নির্ভর হয়ে পড়েছে।
সরাসরি মুখোমুখি যোগাযোগের বদলে মানুষ এখন অধিকাংশ সময় কাটাচ্ছে স্মার্টফোনে। এর ফলে গভীর ও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন মানুষের সময় ও মনোযোগ দখল করে নিচ্ছে, যা দম্পতিদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে।
এছাড়া, অনেকেই বাস্তব সম্পর্কের পরিবর্তে অনলাইন কন্টেন্ট বা ভার্চুয়াল বিনোদনের দিকে ঝুঁকছেন, যা পারিবারিক জীবন গঠনে অনীহা তৈরি করতে পারে। ফলে বিয়ে, সন্তান নেওয়া—এসব বিষয়ে মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অঞ্চলে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার ৯০ শতাংশের বেশি, সেখানে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিপরীতে, যেখানে স্মার্টফোনের ব্যবহার কম, সেখানে জন্মহার কমার হারও তুলনামূলকভাবে কম।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কিশোরীদের মধ্যে। ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের উচ্চমাত্রার এলাকায় ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের জন্মহার প্রায় ২৬ শতাংশ কমে গেছে। গবেষকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে জন্মহার কমার এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের বিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সব বিশেষজ্ঞ এই মতের সঙ্গে একমত নন। অনেকেই মনে করেন, জন্মহার কমার পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেমন—জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষার প্রতি ঝোঁক, কর্মজীবনের চাপ এবং উন্নত জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সহজলভ্যতা।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মনে করেন, আধুনিক সমাজে মানুষ এখন ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যার ফলে পরিবার গঠনের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে।
ভারতসহ বিভিন্ন দেশে জন্মহার ইতোমধ্যেই প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে গেছে। কানাডা, জাপান, সিঙ্গাপুর ও স্পেনের মতো উন্নত দেশগুলোতেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জন্মহার বাড়াতে শুধু আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। বরং মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। স্মার্টফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।