
রাজধানীর একটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ তুলে সাজানো মামলার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দীর্ঘ তিন বছর পর তদন্তে জানা গেছে, পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত একটি নাটক, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থ আদায়। এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী মো. কামরুল আহসান পাভেলকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
রোববার (১৪ জুন) র্যাব-৩ ও র্যাব-১১ এর যৌথ অভিযানে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শিমরাইল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পল্টন থানায় দায়ের করা ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’ এর একটি চাঞ্চল্যকর মামলার প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, পাভেল ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ফাঁসাতে মানবপাচারের অভিযোগ সাজায় এবং পরবর্তীতে সেই অভিযোগের ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১১ এপ্রিল ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পাভেলকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। এরপর তার স্ত্রী পলি আক্তার দাবি করেন, তার স্বামী অপহরণ ও মানবপাচারের শিকার হয়েছেন এবং তার মুক্তির জন্য চার লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ১৮ জুন র্যাব-৩ এর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে র্যাব অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে এবং পরে তাদের পল্টন থানায় সোপর্দ করা হয়। তবে তদন্তে ধীরে ধীরে সন্দেহের উদ্রেক হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, পলি আক্তার ওই রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চাঁদা দাবি করেন এবং অর্থের বিনিময়ে মামলা আপস করার প্রস্তাব দেন।
পরিস্থিতির চাপে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে ১০ লাখ টাকা প্রদান করে। টাকা পাওয়ার পর পলি আক্তার আদালতে জানান, তার স্বামী আসলে সৌদি আরবেই অবস্থান করছেন এবং ফোন বন্ধ থাকায় ভুল বোঝাবুঝির কারণে তিনি মামলা করেছিলেন। এর ফলে অভিযুক্তদের জামিনে মুক্তি পেতে আর কোনো বাধা থাকে না।
এই মামলাটি ২০২২ সালেই নিষ্পত্তি হলেও, ২০২৫ সালে প্রায় একই ধরনের আরেকটি অভিযোগ সামনে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সোনিয়া আক্তার নামে এক নারী একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ তোলেন, যেখানে তার স্বামীকে বিদেশে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করার কথা বলা হয়।
তবে আগের ঘটনার সঙ্গে এই অভিযোগের মিল থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ হয়। তদন্তে দুই নারীর মধ্যে ফোনালাপের তথ্য পাওয়া যায়, যা পুরো ঘটনাকে নতুন মোড় দেয়। ডিবি পুলিশের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, দুটি ঘটনাই ছিল সাজানো এবং একটি চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত।
এই চক্রের মূল লক্ষ্য ছিল রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে অর্থ আদায় করা। অপহরণ ও মানবপাচারের ভয় দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে চাপে ফেলে তারা মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীদের জন্য বিচার পাওয়া কঠিন করে তোলে। তাই এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবশেষে বলা যায়, দীর্ঘ তদন্তের পর এই মামলার আসল রহস্য উদঘাটন হওয়ায় একটি বড় ধরনের প্রতারণা চক্রের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া মূল পরিকল্পনাকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং এই চক্রের অন্যান্য সদস্যদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।