
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বহুল আলোচিত একটি রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করেছে International Crimes Tribunal-2। রোববার (১৪ জুন) ট্রাইব্যুনালটি ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে, যেখানে পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং শাস্তি নির্ধারণের বিস্তারিত ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে গত ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলার রায় ঘোষণা করে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর ঘোষিত ওই রায়ে মোট ৩০ আসামির বিভিন্ন মেয়াদে সাজা নির্ধারণ করা হয়, যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন, দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড এবং স্বল্প মেয়াদি সাজাও রয়েছে।
রায় অনুযায়ী, দুইজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। আদালত মনে করেছে, ঘটনার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ও ভূমিকার ভিত্তিতে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রযোজ্য।
এছাড়া তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায়। আদালতের মতে, এরা ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আরও পাঁচজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং ছাত্রলীগের একজন শীর্ষ নেতা। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই পর্যায়ের সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
আটজনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদস্য এবং ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা রয়েছেন। এছাড়া ১১ জনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী, নিরাপত্তা কর্মী এবং সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি রয়েছেন।
একজন আসামির ক্ষেত্রে আদালত তার হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ১৯ মে সকালে। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় পাশের একটি ফ্ল্যাট থেকে। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ নথিতে আদালত উল্লেখ করেছে, এটি শুধুমাত্র একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, যেখানে একাধিক পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টতার মামলাগুলোর ক্ষেত্রে।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশের পর মামলাটি আবারও জনমনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিচারিক প্রক্রিয়া এবং শাস্তির মাত্রা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে নানা প্রতিক্রিয়া।