
বাংলাদেশ-এর ফুটবলপ্রেম আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল উন্মাদনা, বিশেষ করে ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল-কে ঘিরে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটির ‘হেক্সা মিশন’ সামনে রেখে বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগ এবার স্থান করে নিয়েছে ব্রাজিলের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে।
ব্রাজিলিয়ান জনপ্রিয় গণমাধ্যম গি গ্লোবো তাদের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে তুলে ধরেছে বিস্ময় ও মুগ্ধতার সঙ্গে। হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দেশের মানুষ কীভাবে ব্রাজিল দলের রঙে নিজেদের রাঙিয়ে তোলে, সেটিই তাদের প্রতিবেদনের মূল আকর্ষণ।
বিশ্বকাপের ম্যাচকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-এর নিউ জার্সিতে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচের আগে থেকেই বাংলাদেশের ‘সবুজ-হলুদ’ জ্বর লাতিন আমেরিকার আলোচনায় উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অলিগলি, ছাদ, সড়ক—সব জায়গা ব্রাজিলের পতাকায় ছেয়ে গেছে।
ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ। কারণ, ফিফা র্যাংকিংয়ে ১৮১তম স্থানে থাকা একটি দেশ, যেখানে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তেমন সাফল্য নেই, সেই দেশের মানুষ এতটা আবেগ নিয়ে অন্য একটি দেশের ফুটবল দলকে সমর্থন করছে—এটি তাদের কাছে এক অনন্য ঘটনা।
বিশেষ করে বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। দেশের লাল-সবুজ পতাকার পাশাপাশি ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ কিংবা আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা রঙে সেজে ওঠে পুরো দেশ। এই দৃশ্য ব্রাজিলিয়ানদের কাছে যেমন বিস্ময়ের, তেমনি আনন্দেরও।
এই ভালোবাসার পেছনের ইতিহাসও তুলে ধরেছে ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম। ষাটের দশকে পেলে ও গারিঞ্চা-দের জাদুকরী ফুটবল যখন বিশ্বজয় করছিল, তখন থেকেই বাংলাদেশে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসার শুরু। পরবর্তীতে আশির দশকে জিকো ও সক্রেটিস-দের সময় রঙিন টেলিভিশনের আগমন এই উন্মাদনাকে আরও ছড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশিদের এই ফুটবলপ্রেমকে তুলে ধরতে তৈরি হয়েছে একটি প্রামাণ্যচিত্রও, যার নাম ঢাকা ভাইব্রা – ফুটবল অ্যাডভেঞ্চারস ইন বাংলাদেশ। এটি সম্প্রচারিত হয়েছে গ্লোবোপ্লে-এ। প্রামাণ্যচিত্রটি বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতি ও সমর্থকদের আবেগকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে।
এই ডকুমেন্টারির পরিচালক রাফায়েল বারগামাস্কি বাংলাদেশে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, একজন ব্রাজিলিয়ান হিসেবে ঢাকায় এসে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। তার ভাষায়, বাংলাদেশিরা যেভাবে ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতি, খেলোয়াড় এবং আর্জেন্টিনার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিজেদের করে নিয়েছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
রাজধানী ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে রোনালদো ও নেইমার-দের বিশাল দেয়ালচিত্রও ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব দৃশ্য তাদের কাছে ফুটবলপ্রেমের এক অনন্য উদাহরণ।
তবে এই উন্মাদনার একটি নেতিবাচক দিকও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। সম্প্রতি হবিগঞ্জ-এ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তবুও অতিরিক্ত আবেগ কখনো কখনো সহিংসতায় রূপ নিতে পারে—এই সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে, ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম এক অসাধারণ ঘটনা। মাঠে যখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়া-রা খেলবেন, তখন হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশ থেকেও সমান আবেগে সমর্থন জোগাবে কোটি ভক্ত—এ বিষয়টি এখন ব্রাজিলও ভালোভাবেই জানে।