
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে নতুন করে আশাবাদ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং তেহরানের মধ্যে আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলছে। এমনকি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা “আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কাছাকাছি” অবস্থায় রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য সমঝোতা কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়। বরং এটি দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার একটি প্রাথমিক ধাপ, যেখানে ভবিষ্যৎ চুক্তির কাঠামো নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালীতে বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অবরোধমূলক পদক্ষেপ কমানো। পাশাপাশি আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আরও জটিল বিষয়গুলো সমাধানের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথাও আলোচনায় রয়েছে।
তবে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, ইরান ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। অন্যদিকে ইরানি গণমাধ্যম সম্ভাব্য সমঝোতাকে তেহরানের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হিসেবে উপস্থাপন করছে।
এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত বা ভেঙে ফেলতে এবং ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইরান কি পুরো পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করবে, নাকি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
আরেকটি বড় ইস্যু হলো ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত। যুক্তরাষ্ট্র চায় এসব উপাদান সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করা হোক। কিন্তু অনেক অংশ গভীর ভূগর্ভে থাকায় তা বাস্তবায়ন কঠিন। বিকল্প হিসেবে এগুলো নিষ্ক্রিয় করে পর্যবেক্ষণে রাখার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ। ইরান প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করার দাবি তুলেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি অর্থ হস্তান্তরের কথা অস্বীকার করলেও, সম্পদ অবমুক্ত করার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিতর্ক রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়েও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে আলোচনায়। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ভবিষ্যতে এই পথ ব্যবহারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা।
এছাড়া ইরান-সমর্থিত হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন ও যাচাই করা হবে, তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো কাঠামো নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সব জটিল ইস্যুর কারণে সম্ভাব্য সমঝোতা এখনো অনেক দূরে। এমনকি চুক্তি হলেও সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আশাবাদ থাকলেও বাস্তবতা হলো—পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক রাজনীতি—সব মিলিয়ে চুক্তির পথ এখনও অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত।