
দেশের নতুন শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির বীরত্বগাথা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন পাঠ্যবইয়ে তার জীবন, কর্ম এবং ঘটনাবলি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বুধবার (১০ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
কমিটির দুই সদস্য জানিয়েছেন, নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে একাধিক নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধের আলোকে নতুন পাঠ সংযোজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
একই সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ অধ্যায়ে নতুন কিছু ব্যক্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অধ্যায়ে বর্তমানে তিতুমীর, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, নূর হোসেন, আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধের মতো ব্যক্তিদের জীবন তুলে ধরা হয়েছে। একই কাঠামো অনুসরণ করে ওসমান হাদিকেও অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা যায়, নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও সমসাময়িক আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত করানোর লক্ষ্যেই এ ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে আরও বাস্তব ধারণা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ওসমান হাদি ঝালকাঠির নলছিটির সন্তান। তার বাবা একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ছিলেন। তিনি নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ গঠনের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন। তার রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তার।
গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়, যেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে তার ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে তরুণদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টা তাকে আলোচনায় রাখে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাক্রমে তার জীবন ও কর্মকে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা সমসাময়িক আন্দোলন ও নেতৃত্ব সম্পর্কে আরও জানার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে পাঠ্যসূচিতে নতুন ব্যক্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে শিক্ষা মহলে নানা মতামতও তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসভিত্তিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ, আবার অনেকে মনে করছেন সমসাময়িক বীরত্বগাথা যুক্ত হলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে।
সব মিলিয়ে, ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রমে ওসমান হাদির বীরত্বগাথা যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পাঠ্যসূচি সংস্কারের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।