
প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যস্ত জীবনের এই সময়ে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই কমে আসছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু এই ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একদল তরুণ দেখিয়ে দিচ্ছেন, ইচ্ছাশক্তি, দায়বদ্ধতা এবং মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা থাকলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। টাঙ্গাইল থেকে যাত্রা শুরু করা ‘যুবদের জন্য ফাউন্ডেশন’ এমনই এক মানবিক উদ্যোগের নাম, যা আজ দেশের ৩২টি জেলায় বিস্তৃত হয়েছে।
সংগঠনটির শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় ২০১১ সালে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সমাজকর্মী মুঈদ হাসানের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন’ এবং ‘স্বপ্নপুরী’ নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পথশিশু ও ঝরে পড়া শিশুদের আবার শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ পরবর্তীতে আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হয়। ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘যুবদের জন্য ফাউন্ডেশন’।
সংগঠনটির কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও উপেক্ষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। পরিচয়হীন অসুস্থ ব্যক্তি, বেওয়ারিশ মানুষ কিংবা চিকিৎসাবঞ্চিত বৃদ্ধদের সহায়তায় নিয়মিত কাজ করছে তারা। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা, উদ্ধার ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি মৃত্যুর পর দাফন-কাফনের দায়িত্বও পালন করছে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা।
বয়স্ক ও অবহেলিত মানুষের সহায়তায়ও সংগঠনটি কাজ করছে। রাস্তার পাশে কিংবা বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা প্রবীণদের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বৃদ্ধাশ্রমগুলোতেও নিয়মিত মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সংগঠনটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আত্মসম্মান বজায় রেখে সহায়তা প্রদান। এ লক্ষ্যেই চালু করা হয়েছে ‘১০ টাকার হোটেল’, ‘১০ টাকার ইফতার’, ‘১০ টাকার বই’ এবং ‘১০ টাকার কাপড় বাজার’ কর্মসূচি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ন্যূনতম মূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা গ্রহণ করতে পারেন, যা তাদের মর্যাদা রক্ষা করতেও সহায়তা করে।
শুধু সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেও কাজ করছে সংগঠনটি। স্বাবলম্বী প্রকল্পের আওতায় দুস্থ নারী-পুরুষদের সেলাই মেশিন, হাঁস-মুরগি, ছাগল, ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি সাত শতাধিক মানুষ এবং অনলাইনে প্রায় আট হাজার তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণেও রয়েছে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। চলতি বছরে পাঁচ হাজার গাছ রোপণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। ‘প্লাস্টিক দিন, গাছ নিন’ এবং ‘একজন মানুষ, একটি গাছ’ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বীজ কলম ও বীজ বোমার মতো পরিবেশবান্ধব ধারণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় সংগঠনটির ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। খাদ্য সহায়তা, অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তিদের দাফন এবং অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা। এছাড়া বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগকালেও ত্রাণ, ওষুধ এবং জরুরি সহায়তা নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা।
শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবদান। প্রায় দেড় দশক ধরে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশু আজ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। যারা একসময় শিক্ষার বাইরে ছিল, তাদের অনেকেই বর্তমানে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মুঈদ হাসান জানিয়েছেন, চলতি বছরে অনলাইনে আট হাজার যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষণ প্রদান, ৫০ জনকে স্বাবলম্বী করা, বিভিন্ন জেলায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
টাঙ্গাইলের একদল সাধারণ তরুণের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই মানবিক আন্দোলন আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আশার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের কার্যক্রম মনে করিয়ে দেয়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা এবং মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছাশক্তি। মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের এই চর্চা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।