
লিওনেল মেসিকে এখন আগের মতো পুরো মাঠজুড়ে দৌড়াতে খুব কমই দেখা যায়। বরং অনেক সময় তাকে হাঁটতে দেখা যায়, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায় কিংবা খেলার গতি বুঝে নিজেকে নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করাতে দেখা যায়। সমালোচকদের কেউ কেউ একসময় এটিকে বয়সের প্রভাব হিসেবে দেখলেও ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, এটি আসলে মেসির অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তা এবং কৌশলগত বিবর্তনের ফল।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা যদি আবারও শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে পারে, তবে ৩৮ বছর বয়সী মেসির ভূমিকা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে বর্তমানের মেসিকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের দিকে।
২০০৩ সালে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেকের সময় মেসি ছিলেন গতি, ড্রিবলিং ও বিস্ফোরক আক্রমণের প্রতীক। ডান প্রান্তে খেলতে খেলতে তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে দিতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছেন মেসিও।
বার্সেলোনায় পেপ গার্দিওলার অধীনে মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় পরিবর্তন আসে। উইং থেকে তাকে নিয়ে আসা হয় মাঠের কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক ফুটবলের বহুল আলোচিত ‘ফলস নাইন’ কৌশল। প্রথাগত স্ট্রাইকারের মতো বক্সে অবস্থান না করে মেসি মাঝমাঠে নেমে এসে বল নিয়ন্ত্রণ করতেন, আক্রমণ সাজাতেন এবং প্রয়োজনমতো গোল করতেন।
এই পরিবর্তন শুধু মেসির খেলার ধরনই বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত চিন্তাধারাও। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা প্রায়ই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না—তারা কি মেসিকে অনুসরণ করবেন, নাকি নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবেন। সেই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়েই বার্সেলোনা একের পর এক সাফল্য অর্জন করে।
পরবর্তীতে জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার মতো মাঝমাঠের তারকারা দল ছাড়ার পর মেসির দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তখন তিনি শুধু গোলদাতা নন, আক্রমণের প্রধান নির্মাতাও হয়ে ওঠেন। মাঝমাঠে নেমে এসে খেলা তৈরি করা, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং নিজেও গোল করা—সবকিছু একসঙ্গে করতে শুরু করেন তিনি।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলেও তার বিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে যেখানে তিনি ছিলেন মূলত একজন আক্রমণভাগের তারকা, পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন দলের নেতা, সংগঠক এবং অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে তার নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনা দলে খেলতে গিয়ে মেসিকে প্রায়ই হাঁটতে দেখা যায়। কিন্তু এই হাঁটা অলসতা নয়। বরং তিনি খেলার ছন্দ, প্রতিপক্ষের অবস্থান এবং ফাঁকা জায়গাগুলো বিশ্লেষণ করেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার জন্যই তিনি নিজের শক্তি সংরক্ষণ করেন।
ফুটবল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শারীরিক ও কৌশলনির্ভর। এমন বাস্তবতায় একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে দুই দশক ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু মেসি তা সম্ভব করেছেন কারণ তিনি কখনো একই ধরনের খেলোয়াড় হয়ে থাকেননি। উইঙ্গার থেকে ফলস নাইন, ফলস নাইন থেকে প্লেমেকার এবং পরে নেতৃত্বদাতা অধিনায়ক—প্রতিটি পর্যায়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন।
এ কারণেই অনেকের মতে, মেসির মাঠে হাঁটা আসলে বয়সের সীমাবদ্ধতার প্রতীক নয়; বরং এটি একজন অভিজ্ঞ ফুটবলারের কৌশলগত পরিপক্বতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি জানেন কখন দৌড়াতে হবে, কখন থামতে হবে এবং কখন একটি মুহূর্তেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে হবে।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক বড় খেলোয়াড় এসেছেন, কিন্তু খুব কম খেলোয়াড়ই নিজেদের এতবার নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পেরেছেন। লিওনেল মেসির গল্প শুধু প্রতিভার নয়, বরং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার এক অসাধারণ উদাহরণ। আর সেই কারণেই, দুই দশকেরও বেশি সময় পরও তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত এবং প্রভাবশালী নাম হয়ে আছেন।