
দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়াতে এবং জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে জেলেদের জন্য বাড়তি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময়কালে জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষি মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সদস্য এম শাহাদাত হোসেনের উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ একটি নোটিশের জবাবে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ইলিশের পোনা জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের সহায়তার পরিমাণ ও পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, জাটকা ধরা বন্ধ রাখা সরকারের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি। তবে দারিদ্র্য ও জীবিকার তাগিদে অনেক জেলে নিষিদ্ধ সময়েও মাছ ধরতে বাধ্য হন। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এমন উদ্যোগ নিতে চায়, যাতে জেলেরা মাছ ধরার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প আয়ের সুযোগ পান।
তিনি আরও জানান, দেশের উপকূলীয় ও নদীকেন্দ্রিক অনেক জেলে দীর্ঘদিন ধরে ‘দাদন’ নামে পরিচিত অনানুষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এ ব্যবস্থায় মহাজন বা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে পরে বাধ্যতামূলকভাবে কম দামে মাছ বিক্রি করতে হয়। ফলে জেলেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং ঋণের একটি চক্রের মধ্যে আটকে পড়েন।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকার প্রাণিসম্পদ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অন্যান্য আয়বর্ধক কর্মসূচিভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প পেশা বা আয়মুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন। এর ফলে দাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমও আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংসদে আলোচনার সময় জানানো হয়, প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ে জাটকা সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২৫ সেন্টিমিটারের কম আকারের ইলিশ ধরা, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সরকার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে।
মন্ত্রী জানান, চাঁদপুর, বরিশালসহ ইলিশ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ জেলা এবং পদ্মা-মেঘনা নদী অঞ্চলে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের ফলে জাটকা সংরক্ষণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রজনন সক্ষমতা রক্ষায় জাটকা সংরক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সরকারের সহায়তা কার্যক্রম, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নজরদারি একসঙ্গে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের ইলিশ সম্পদ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং জেলে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সরকারের নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।