
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী উচ্চ শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্য পুনর্গঠনের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এই নীতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে তা কিছুটা কমিয়ে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর ১০ শতাংশ থেকে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রথমে ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলেও পরে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (ART) কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আসে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক হার পরিবর্তন করে গড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশে স্থির করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বহু পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বা কম শুল্ক সুবিধা দিতে হবে, যা আগামী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে আরও সম্প্রসারিত হবে।
বিশ্লেষকদের দাবি অনুযায়ী, চুক্তিতে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো পণ্যের প্রবেশাধিকার সহজ করা হয়েছে। খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা এবং শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, মান যাচাই, মেধাস্বত্ব ও ডিজিটাল ডেটা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত হবে বলে সমালোচনা উঠেছে।
চুক্তির অন্যতম বিতর্কিত দিক হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে অশুল্ক বাধা সংক্রান্ত শর্ত। এতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদ থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে না বলে বলা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি বাংলাদেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্বাধীনতা কমিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বৃদ্ধির শর্তও রয়েছে। এতে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আমদানি বাড়ানো, বিশেষ কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম সীমিত করা এবং জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বিষয় উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ তৈরি করলেও একই সঙ্গে এটি একতরফা নির্ভরশীলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন এবং স্থানীয় কৃষি খাতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সমর্থকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হওয়া বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কিছুটা স্থিতিশীলতা পেতে পারে।
চুক্তি নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠেছে এর স্বচ্ছতা, আলোচনার প্রক্রিয়া এবং স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, বড় কোনো ব্যবসায়ী বা বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠীকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং প্রক্রিয়াটি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এই বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য কতটা লাভজনক বা ক্ষতিকর হবে, তা বাস্তবায়নের পরই স্পষ্ট হবে।