
জীবনের সবচেয়ে শক্ত মানুষটিও মায়ের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। বুধবার বিকেলে জিয়া উদ্যানের নীরবতা ভেঙে সেই অসহায়তারই এক করুণ দৃশ্যের সাক্ষী হলো দেশ। চিরবিদায়ের মুহূর্তে মায়ের কবরে ফুল দিতে গিয়ে অঝোরে কাঁদলেন তারেক রহমান। চোখের জল আর থরথর কাঁপা হাতে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন সেই মাকে—যিনি ছিলেন শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, ছিলেন তাঁর জীবনের আশ্রয়, শক্তি ও প্রেরণা।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সমাহিত করা হয় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। ইতিহাসের দুই শক্তিমান চরিত্র যেন একই মাটির নিচে আবার মিলিত হলেন—এই দৃশ্যেও ছিল এক গভীর বেদনাবোধ।
দাফন শেষে যখন কবরে ফুল অর্পণ করতে এগিয়ে যান তারেক রহমান, তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। চোখের বাঁধ ভেঙে নেমে আসে অশ্রুধারা। রাষ্ট্র, রাজনীতি, নেতৃত্ব—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে সে মুহূর্তে তিনি শুধু একজন সন্তান, যে হারিয়েছে তার মাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা ও তিন বাহিনীর প্রধানরাও নীরবে প্রত্যক্ষ করেন সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
এর আগে বিকেল তিনটার পর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় খালেদা জিয়ার জানাজা। হাজারো মানুষ, অসংখ্য চোখের জল, অগণিত দোয়ার ফাঁকে ফাঁকে উচ্চারিত হয় এক নাম—খালেদা জিয়া। জানাজা শেষে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো মরদেহ কড়া নিরাপত্তায় নিয়ে যাওয়া হয় জিয়া উদ্যানে।
সমাধির কাছাকাছি পৌঁছালে দৃশ্যপট আরও ভারী হয়ে ওঠে। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা সম্মানের সঙ্গে কাঁধে তুলে নেন তাঁর কফিন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আনুষ্ঠানিকতা শেষে, স্বামীর পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি—সংগ্রাম আর ভালোবাসার এক অনন্ত সহযাত্রার প্রতীক হয়ে।
জানাজা নামাজে ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মো. আব্দুল মালেক। জানাজার আগে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা কণ্ঠে সবার কাছে মায়ের জন্য দোয়া চান তারেক রহমান। চোখ ভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন,
“দোয়া করবেন… আল্লাহতায়ালা যেন আমার মাকে বেহেশত নসিব করেন।”
দিনের শুরু থেকেই রাজধানী যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছায় তারেক রহমানের গুলশানের বাসভবনে। সেখান থেকে সংসদ ভবন হয়ে জিয়া উদ্যান—এই পথজুড়ে মানুষের ঢল নামে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, শাহবাগ—সবখানে শুধু মানুষের ভিড় আর শোকের নীরবতা।
ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরাও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন। তবে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার ভিড় ছাপিয়ে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হয়ে রইল একটি দৃশ্য—মায়ের কবরে ফুল রেখে অঝোরে কাঁদতে থাকা এক সন্তানের নিঃশব্দ কান্না।
মাটির নিচে শুয়ে আছেন খালেদা জিয়া, কিন্তু সেই কান্না বলে দেয়—তিনি ছিলেন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি ছিলেন একজন মা। আর সেই মায়ের শেষ বিদায়ে ভেঙে পড়া সন্তানের অশ্রু ইতিহাসের পাতায় চিরদিন লেখা থাকবে।