
ইরানের জব্দকৃত সম্পদ নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোতে সাম্প্রতিক হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মেরামত ও পুনর্গঠনের কাজে এসব সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েত ও বাহরাইনের ওপর সাম্প্রতিক ইরানি হামলার পর ওয়াশিংটন এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একটি বিশেষ টিমকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ক্ষতির ক্ষেত্রেও জব্দকৃত ইরানি সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ী দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্তি না দিলে আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব নয়। তার মতে, এই অর্থ ছাড় করা হলে সেটি দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরিকল্পনা সেই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইরানের হাতে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে অন্যত্র ব্যবহারের চিন্তা দুই দেশের মধ্যকার বিশ্বাসের সংকট আরও বাড়াতে পারে এবং আলোচনার পথকে কঠিন করে তুলতে পারে।
যদিও মার্কিন প্রশাসন কোন ধরনের সম্পদ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে শুধু স্থগিত রাখা অর্থ নয়, ইরান-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আর্থিক সম্পদও এই পরিকল্পনার আওতায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একজন মন্ত্রী সম্প্রতি তেহরান সফর করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির কাছে বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সফরে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গেও বৈঠক করেন।
অচলাবস্থার মধ্যেই নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা কয়েকটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এর পরপরই হরমুজ প্রণালির গোরুক ও কেশম দ্বীপ এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়।
এর জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করে। কুয়েত জানিয়েছে, সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। যদিও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, কিছু অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বাহরাইনেও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই চুক্তির মাধ্যমে সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ইরান তাদের তেল রপ্তানি আয়ের ওপর পূর্ণ প্রবেশাধিকার, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে অধিক নিয়ন্ত্রণ চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ছাড়ের ইঙ্গিত দেয়নি।
অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবুও ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনো কঠোর বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।