
বিয়ে মুসলিম জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বন্ধন। এই বন্ধনকে ঘিরে ধর্মীয় ও আইনগত উভয় ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তবে বাস্তবে দেখা যায়, বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা অর্থাৎ ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ার আগেই অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামা পূরণ ও স্বাক্ষরের কাজ শেষ করে ফেলা হয়। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সতর্কতা।
সাধারণত বিয়ের তারিখ নির্ধারণ হওয়ার পর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নানা প্রস্তুতি শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে অনেক সময় বিয়ের কয়েক ঘণ্টা বা এক-দুই দিন আগেই কাবিননামা পূরণ করে বর-কনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে তখনও পর্যন্ত তারা স্বামী-স্ত্রী নন। ফলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে কাবিননামায় তথ্য প্রদান বা স্বাক্ষর করার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কাবিননামার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ১৮ নম্বর ধারা। এই ধারায় জানতে চাওয়া হয়, স্বামী কি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেছেন কি না। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় এটিকে ‘তাফভিজে তালাক’ বলা হয়।
তাফভিজে তালাকের বিষয়টি স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর কার্যকর হয়। অর্থাৎ বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার আগেই যদি এ ধরনের অধিকার লিখিতভাবে প্রদান করা হয়, তাহলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের আগে স্ত্রী হিসেবে কোনো নারীর অস্তিত্ব না থাকায় তাকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার বিষয়টি বাস্তবিক ও শরয়ি উভয় দিক থেকেই জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। পরবর্তীতে যদি সেই অধিকার প্রয়োগের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তালাক কার্যকর হয়েছে কি না—তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের বিভ্রান্তি ভবিষ্যতে পারিবারিক ও ধর্মীয় উভয় ক্ষেত্রেই গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কেউ যদি নিজেকে তালাকপ্রাপ্ত মনে করে নতুন বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন, অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকে, তাহলে তা বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাবিননামা পূরণ করা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। এ ক্ষেত্রে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে পরামর্শ হচ্ছে, বিয়ের ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার পর কাবিননামার সব ধারা পূরণ এবং প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সম্পন্ন করা। তখন বর ও কনে বৈধভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃত হন এবং কাবিননামার বিভিন্ন শর্ত ও ধারাও যথাযথভাবে কার্যকর হওয়ার সুযোগ পায়।
ধর্মীয় আলেমরা মনে করেন, বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত ও সামাজিক চুক্তির ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো বা প্রচলিত রীতির কারণে কোনো ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত নয়। বরং শরিয়তসম্মত ও আইনসম্মত উপায়ে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই উত্তম।
সচেতনতা ও সঠিক জ্ঞানের মাধ্যমে বিয়েকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনেক বিভ্রান্তি ও ভবিষ্যৎ জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব। তাই কাবিননামা পূরণের সময় ও পদ্ধতি সম্পর্কে বর, কনে, অভিভাবক এবং কাজি—সবারই যথাযথভাবে অবগত থাকা প্রয়োজন।