
উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে রবিবার দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। এই সফরকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে কারণ শি দীর্ঘ সময় পর সরাসরি পিয়ংইয়ং সফরে যাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শি চিনপিংয়ের ব্যক্তিগত উপস্থিতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বিদেশ সফর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা বেইজিংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেন। এমন প্রেক্ষাপটে তার উত্তর কোরিয়া সফর চীনের কৌশলগত বার্তার অংশ বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
শি চিনপিং সর্বশেষ ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন। এরপর আর তিনি পিয়ংইয়ং যাননি। তবে এক বছর আগে বেইজিংয়ে কিম জং উনের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছিল। সেই সময় আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চীন উদ্বিগ্ন। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে এবং বিনিময়ে অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে বিপুল পরিমাণ সহায়তা দিয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য। এতে সামরিক প্রযুক্তি ও সংবেদনশীল সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তিত সমীকরণ চীনের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। দীর্ঘদিন ধরে চীন ছিল উত্তর কোরিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। তবে রাশিয়ার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক সেই প্রভাবকে কিছুটা হলেও ভারসাম্যহীন করে তুলছে।
উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, শি চিনপিংয়ের এই সফর প্রমাণ করছে যে চীন এখন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। চলতি বছরে দেশটি একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করেছে বলে দাবি করেছে।
এছাড়া পারমাণবিক কর্মসূচি সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নতুন একটি উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেছেন কিম জং উন। এতে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কোরীয় উপদ্বীপ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির অবস্থায় রয়েছে। ১৯৫৩ সালের পর থেকে দুই কোরিয়ার মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। ফলে সীমান্ত অঞ্চল সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়া আশা করছে, শি চিনপিংয়ের এই সফর আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই বৈঠকে শুধু চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং কোরীয় উপদ্বীপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও আলোচনা প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে শি চিনপিংয়ের এই সফর পূর্ব এশিয়ার কূটনৈতিক ভারসাম্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।