
রংপুর জেলায় মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে পানিতে ডুবে ১২ জনের প্রাণহানির ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে ৮ জন শিশু, ৩ জন কিশোর এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। একের পর এক এমন মর্মান্তিক ঘটনায় পরিবারগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে পীরগাছা উপজেলায়। এছাড়া তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ এবং রংপুর মহানগরীতেও পৃথক ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা গেছেন। শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
সর্বশেষ রোববার বদরগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বুজরুক বাগবাড়ি গ্রামে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর সাজেদুল ইসলাম নামে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের মরদেহ একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পীরগাছা উপজেলায় কয়েক দিনের মধ্যে ছয় শিশুর মৃত্যু সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে পৃথক ঘটনায় পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু, রাজীব মিয়া, সেনাতুল আক্তার, সোহাগ, আবিদ হাসান এবং ১৪ মাস বয়সী ওয়াজেদ আলী পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুরা পরিবারের অজান্তে বাড়ির পাশের পুকুর বা জলাবদ্ধ এলাকায় চলে গিয়েছিল।
গঙ্গাচড়া উপজেলায় গত ২৭ মে একই পরিবারের দুই ভাইবোন রুশা মনি ও সাইফ পানিতে ডুবে মারা যায়। তাদের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে ২৯ মে তারাগঞ্জ উপজেলার যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নেমে অহিদ ইসলাম ও মাসুদ রানা নামে দুই কিশোরের মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা একসঙ্গে গোসল করতে গিয়ে পানির স্রোতে তলিয়ে যায়।
রংপুর মহানগরীতেও ঘটেছে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। গত ৫ জুন ঘাঘট নদীতে গোসল করতে নেমে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিহাব পানিতে ডুবে মারা যান। তার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও স্থানীয় এলাকায় শোক নেমে আসে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় খোলা পুকুর, ডোবা, খাল ও নদীর চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। শিশুদের একা বাইরে যেতে না দেওয়া, জলাশয়ের চারপাশে সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অভিভাবকদের নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. গওসুল আজিম চৌধুরী বলেছেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
এদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা কঠিন। ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, পুকুর ও জলাশয়ের চারপাশে বেড়া, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হলে অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প সময়ের মধ্যে এত প্রাণহানি রংপুরের জন্য একটি সতর্ক সংকেত এবং শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।