
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহু বছর ধরেই অদ্ভুত এক সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। এই সংকট শুধু সূচকের পতন, তারল্যের ঘাটতি বা বিনিয়োগকারীদের লোকসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর গভীরে রয়েছে “আস্থার সংকট”। বাজারে অর্থ হারানো একজন বিনিয়োগকারী হয়তো আবারও বিনিয়োগ করতে পারেন, কিন্তু একবার আস্থা হারালে তাকে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। আর সেই কারণেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এত বেশি।
নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ অনেকের কাছেই একটি নতুন সূচনার প্রতীক। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, বিতর্ক, দুর্বল তদারকি এবং নানামুখী অনিয়মের পর মানুষ এমন একজন নেতৃত্ব দেখতে চায়, যিনি শুধু নিয়ম প্রণয়ন করবেন না, বরং সেগুলোর নিরপেক্ষ বাস্তবায়নও নিশ্চিত করবেন। তবে এই যাত্রার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো বাজারের কারিগরি সমস্যাগুলো নয়; বরং ক্ষমতার চারপাশে দ্রুত জড়ো হয়ে যাওয়া সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এবং চাটুকার সংস্কৃতিকে প্রতিহত করা।
আমাদের সমাজে একটি পুরোনো প্রবণতা রয়েছে। নতুন কোনো ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার সঙ্গে সঙ্গেই একদল মানুষ তাঁর চারপাশে ভিড় জমাতে শুরু করে। এদের হাতে থাকে প্রশংসার ফুলঝুরি, মুখে থাকে মধুর ভাষা, আর অন্তরে থাকে ব্যক্তিগত স্বার্থের হিসাব। তারা কখনো উপহারের মাধ্যমে, কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে, আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত প্রশংসার মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চায়। এদের মূল লক্ষ্য ব্যক্তি নয়, ক্ষমতা; নীতি নয়, সুবিধা।
পুঁজিবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বড় বড় অনিয়ম, কারসাজি ও বিনিয়োগকারী ক্ষতির পেছনে প্রায়শই এমন একটি গোষ্ঠী সক্রিয় থাকে, যারা ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছে। তারা কখনো নিজেদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করে, কখনো বাজার বিশ্লেষকের মুখোশ পরে, আবার কখনো বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেকের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে ব্যক্তিগত প্রভাব বৃদ্ধি, গোষ্ঠীগত সুবিধা অর্জন কিংবা নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই গোষ্ঠীগুলো সাধারণত অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের অবস্থানও বদলে নেয়। গতকাল যাদের বিরুদ্ধে ছিল, আজ তাদের প্রশংসা করে; আর আজ যাদের প্রশংসা করছে, কাল প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে দ্বিধা করে না। তাদের কোনো আদর্শিক অবস্থান নেই; আছে শুধু সুবিধা পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- তিনি কাদের কথা শুনবেন? যারা প্রতিদিন প্রশংসার বন্যা বইয়ে দেবে, নাকি যারা প্রয়োজন হলে সমালোচনাও করবে? কারণ প্রকৃত সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় সহায়ক সবসময় প্রশংসাকারী নয়; বরং সেই ব্যক্তি, যিনি তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ভুলগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংশোধনের পরামর্শ দেন।
বিশ্বের সফল পুঁজিবাজারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর শক্তি ব্যক্তিনির্ভর নয়, প্রতিষ্ঠাননির্ভর। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গবেষণা, তথ্য, পরিসংখ্যান এবং বাজার বাস্তবতার ভিত্তিতে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক চাপ কিংবা তোষামোদ সেখানে কোনো নীতিনির্ধারণী উপাদান নয়। যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারগুলোতে নিয়ন্ত্রকদের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছে এই কারণেই যে তারা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ উপেক্ষা করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
বাংলাদেশেও যদি পুঁজিবাজারকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে বিএসইসিকে একই পথ অনুসরণ করতে হবে। কমিশনের দরজা সবার জন্য খোলা থাকতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে জায়গা পাওয়া উচিত কেবল তথ্য, যুক্তি এবং জনস্বার্থের। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট যেন নিজেদের ঘনিষ্ঠতার কারণে বিশেষ সুবিধা না পায়, এ বিষয়টি নিশ্চিত করা নতুন নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বিশেষভাবে প্রয়োজন কমিশনের ভেতরে একটি শক্তিশালী পেশাদার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এমন একটি পরিবেশ, যেখানে কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আনুগত্য নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধকে অগ্রাধিকার দেবেন। যেখানে কোনো সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হবে তার গুণগত মান দিয়ে, কোনো ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য দিয়ে নয়। কারণ চাটুকারিতা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে না।
আজ বাংলাদেশের লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা কোনো অলৌকিক পরিবর্তন চায় না। তারা শুধু চায় ন্যায়সঙ্গত আচরণ, সমান সুযোগ এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা। তারা দেখতে চায়, বাজার কারসাজিকারী, ইনসাইডার ট্রেডার, গুজব ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সত্যিই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
নতুন চেয়ারম্যানের জন্য তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয়তো বাজারের সূচক বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি বার্তা দেওয়া যে, বিএসইসি আর কোনো ব্যক্তির নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়, কোনো সিন্ডিকেটের নয়; এটি দেশের সব বিনিয়োগকারীর প্রতিষ্ঠান। এখানে চাটুকারিতার নয়, যোগ্যতার মূল্য থাকবে; ব্যক্তিগত সম্পর্কের নয়, আইনের শাসনের প্রাধান্য থাকবে; এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার নয়, সততা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন হবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই বার্তাটি কতটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, একটি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার জন্য বাইরের শত্রুর প্রয়োজন হয় না; ভেতরের সুবিধাবাদীরাই অনেক সময় যথেষ্ট। আর তাই সময়ের দাবি একটাই- বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব যেন সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়ার আগে নিজের চারপাশ থেকে চাটুকার, সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত একটি বলয় তৈরি করেন। সেখান থেকেই শুরু হতে পারে আস্থা পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায়, যার জন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছে।
লেখক-
মোঃ সাইফুল ইসলাম (পিপন)
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দ্যা ডেইলি কসমিক পোষ্ট বাংলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দ্যা ডেইলি কসমিক পোষ্ট বাংলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]