
ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত বুড়িগঙ্গা নদীকে রক্ষায় জাতীয় বাজেটে পৃথক ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী ও নাগরিক সংগঠনগুলো। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে নদীটি ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
শনিবার (৬ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। সংগঠনের সমন্বয়ক মিহির বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে পরিবেশ ও নদী রক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বুড়িগঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, এটি রাজধানী ঢাকার পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব, দূষণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে নদীটি তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়েছে।
বক্তারা বুড়িগঙ্গা রক্ষায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে নদীর অবৈধ দখলদারদের দ্রুত উচ্ছেদ, নদীর প্রকৃত সীমানা পুনর্নির্ধারণ, জাতীয় বাজেটে নদী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের জন্য স্থায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করা, নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং পরিচালনা এবং শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।
এ ছাড়া নদী রক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী নদী রক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির মতে, নদী সংরক্ষণ কার্যক্রমকে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি করতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, জনবল এবং বাজেটসহ একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি।
সমাবেশে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসূল বলেন, বুড়িগঙ্গা ঢাকার জীবনরেখা হলেও বর্তমানে এটি মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে টেকসই ড্রেজিং কার্যক্রম, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং পৃথক বাজেট কাঠামো প্রয়োজন। তিনি পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাপার যুগ্ম সম্পাদক ও গ্রীন ভয়েসের কো-ফাউন্ডার হুমায়ুন কবির সুমন, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের শাকিল আহমেদসহ অন্য বক্তারাও একই ধরনের মতামত তুলে ধরেন। তারা বলেন, নদী রক্ষার জন্য শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই হবে না, বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মিহির বিশ্বাস বলেন, বুড়িগঙ্গার বর্তমান সংকট কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল এবং দূষণের কারণে নদীটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। তিনি মনে করেন, দখলমুক্তকরণ ও নিয়মিত খনন কার্যক্রম ছাড়া নদীকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় বাজেটে বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধারের জন্য পৃথক ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নদী রক্ষায় বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশ থেকে বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, বুড়িগঙ্গা রক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। তাদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে রাজধানীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর আরও ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে।