
বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সক্ষমতা রাখে ‘এল নিনো’। আর যখন এই প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনাটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নেয়, তখন সেটিকে বলা হয় ‘সুপার এল নিনো’। সাম্প্রতিক সময়ে আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশান্ত মহাসাগরে এমন পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। এর ফলে বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। যখন এই উষ্ণতা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে, তখন সেটি ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা যায়। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও তীব্র খরা ও দাবদাহ দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশ সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে না থাকলেও বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী এল নিনোর সময় দেশে গ্রীষ্মকাল আরও উষ্ণ হতে পারে এবং তাপপ্রবাহের মাত্রা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরণেও পরিবর্তন আসার আশঙ্কা থাকে।
কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে ধান, গম, ভুট্টা ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে অতিরিক্ত তাপমাত্রা কৃষি শ্রমিকদের কর্মক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে।
পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। খরা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়বে। ফলে অনেক এলাকায় সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন।
তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুপার এল নিনোর সম্ভাবনা থাকলেও এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে এর তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার অন্যান্য উপাদানের ওপর। তাই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে কৃষি, পানি সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
সুপার এল নিনো নিয়ে আলোচনা ও সতর্কতা বাড়লেও এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এমন বৈশ্বিক ঘটনাগুলো বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে উঠছে।