
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় আলুর দরপতনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কমে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ঘরে সংরক্ষিত আলু ফেলে দিচ্ছেন বা পচে নষ্ট হতে দেখছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তাদের খরচ পড়ছে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ টাকা। অথচ পাইকারি বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৭ টাকা কেজি দরে। এতে প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
গঙ্গাচড়ার কুড়িয়ার মোড় এলাকার কৃষক মিজানুর বলেন, “এক কেজি আলুতে খরচ পড়েছে ১৮ টাকা। পাইকাররা দেয় ৫ টাকা। হিমাগারে রাখলেও খরচ বেশি, তাই ঘরেই রেখেছিলাম। এখন ৮০ বস্তা আলু পচে শেষ হয়ে গেছে, বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “এ আলু আমাকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে। বর্গা জমিতে চাষ করেছিলাম, লাভ তো দূরের কথা, খরচও তুলতে পারিনি।”
শুধু মিজানুর নন, উপজেলার প্রায় ২০০ জন কৃষক একই সংকটে পড়েছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে এবং খোলা জায়গায় শত শত বস্তা পচা আলু পড়ে আছে। কোথাও কোথাও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
চেংমারী গ্রামের কৃষক চান মিয়া জানান, তিনি প্রায় ৩ একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ভালো ফলন হলেও বাজারে দাম না থাকায় আলু বিক্রি করতে পারেননি। কিছু আলু হিমাগারে রাখলেও প্রায় ২০০ বস্তা বাড়িতে রেখেছিলেন, যা টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতায় নষ্ট হয়ে গেছে।
গঙ্গাচড়া এলাকার আলু ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, শুধু উৎপাদন নয়, পরিবহন, বস্তা, শ্রমিক ও হিমাগার খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২০ টাকা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭–৮ টাকা দরে। ফলে ব্যবসাও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গঙ্গাচড়ায় ৫ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার টন আলু, যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বেশি। অতিরিক্ত উৎপাদনই বাজারে দরপতনের অন্যতম কারণ।
এছাড়া আগাম বৃষ্টিতে প্রায় ৬০ হেক্টর জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরদিকে উপজেলায় একমাত্র হিমাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বস্তা হলেও সেটি ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ঘরেই আলু সংরক্ষণ করেন, যা পরে নষ্ট হয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন জানান, যারা আগেভাগে আলু তুলেছেন তারা তুলনামূলক ভালো অবস্থায় ছিলেন। তবে দেরিতে তোলা আলু বৃষ্টি ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আবহাওয়ার অস্থিরতা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই এই সংকটের মূল কারণ।
সব মিলিয়ে রংপুরের এই আলু সংকট কৃষকদের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এমন সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।