
ভোরের আলো জানালায় এসে পড়লেও ঘুম ভাঙে দেরিতে। দিনের প্রথম খাবার—নাশতা—অজান্তেই বাদ পড়ে। ফোন এখন দিনের প্রথম সঙ্গী। একসময় যে কাজগুলো আনন্দ দিত, সেগুলো আর আগ্রহ জাগায় না। অল্পতেই বিরক্তি, সারাক্ষণ ক্লান্তি এবং মনোযোগের অভাব—এই উপসর্গগুলো আজ অসংখ্য মানুষের নীরব বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল অলসতা নয়; বরং নীরব অবসাদ বা ডিপ্রেশন ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)–এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২৮ কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রার অবসাদে ভুগছেন। অনেক সময় অবসাদ প্রকাশ পায় দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যে—দেরিতে ঘুম ভাঙা, ক্ষুধামান্দ্য, আগ্রহহীনতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তির মাধ্যমে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) জানাচ্ছে, আগে আনন্দদায়ক কাজগুলোতে আগ্রহ হারানো—যা অ্যানহেডোনিয়া (Anhedonia) নামে পরিচিত—ডিপ্রেশনের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত নাশতা বাদ দেওয়া এবং অপর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের সেরোটোনিন ও ডোপামিন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা মুড সুইং, হতাশা ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ায়।
সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ফোনে হাত চলে যাওয়া এখন স্বাভাবিক অভ্যাস। তবে গবেষণা বলছে, দিনের শুরুতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে গেলে উদ্বেগ এবং আত্মতুলনামূলক চিন্তা বৃদ্ধি পায়। রাত জাগার অভ্যাসও মানসিক ক্লান্তি বাড়ায়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) জানিয়েছে, নিয়মিত গভীর ঘুমের অভাব সিদ্ধান্ত গ্রহণক্ষমতা দুর্বল করে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা সৃষ্টি করতে পারে।
চীনা মনীষীরা হাজার বছর আগে এই সংকট বুঝেছিলেন। দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন, “যে ব্যক্তি দৈনন্দিন শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে পারে না, সে বড় কোনো লক্ষ্যেও স্থির থাকতে পারে না।” চীনা চিকিৎসাবিদ্যা অনুসারে, রাত ১০টার আগে ঘুমানো গুরুত্বপূর্ণ। লাওৎসে বলেছিলেন, “প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জীবনই মানুষের প্রকৃত শক্তি।”
জাপানি জীবনদর্শনে ভোরের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রবাদ বলে, “Early to bed, early to rise—that is the way to live long.” ইকিগাই দর্শনে ভোরের সময় নিজেকে ও জীবনের উদ্দেশ্য বোঝার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কাইজেন দর্শন অনুসারে, প্রতিদিন একটু আগে ঘুমানো ও উঠার অভ্যাস অবসাদ কমাতে সাহায্য করে। হার্ভার্ডের গবেষণাও বলছে, সকালের প্রাকৃতিক আলো মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা মন ভালো রাখতে সহায়ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীরব অবসাদ থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন:
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, ভোরে ওঠা, নিয়মিত নাশতা, ফোন ব্যবহারে সংযম, প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা।
মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সুস্থ জীবনের মৌলিক অধিকার। প্রাচীন চীন ও জাপানের দর্শন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণা একসঙ্গে সতর্ক করছে: সুস্থ মন ও সুস্থ জীবন শুরু হয় শৃঙ্খলাবদ্ধ রাত আর সচেতন ভোর দিয়ে।