
জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইওয়াতে অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল অবশেষে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। টানা ১১ দিনের প্রাণপণ প্রচেষ্টার পর আগুনটি দমন করতে সক্ষম হয়েছেন দমকল বাহিনী ও সামরিক সদস্যরা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি গত ৩০ বছরের মধ্যে জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম দাবানল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দাবানলটি এপ্রিলের শেষ দিকে শুরু হয়ে দ্রুত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আগুন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে কয়েক শত দমকলকর্মী ও সহস্রাধিক সামরিক সদস্য একযোগে কাজ শুরু করেন। আকাশপথে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পানি নিক্ষেপ এবং স্থলপথে আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা—দুই দিক থেকেই অভিযান চালানো হয়।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আগুনে প্রায় ১,৬০০ হেক্টর বনাঞ্চল পুড়ে গেছে। এই বিশাল এলাকা তুলনা করলে বোঝা যায়, এটি সেন্ট্রাল পার্ক-এর প্রায় পাঁচ গুণ বড়। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে আশপাশের বসতিগুলো হুমকির মুখে পড়ে এবং দ্রুত হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
জাপানের ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি জানিয়েছে, এই দাবানলে অন্তত আটটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুইজন সামান্য আহত হয়েছেন। যদিও প্রাণহানির সংখ্যা কম, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বড় হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ওৎসুচি শহরের মেয়র কোজো হিরানো ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের জানান, সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কিছু এলাকায় এখনো ধিকিধিকি আগুন জ্বলতে পারে, তাই পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। শীতকাল আগের তুলনায় বেশি শুষ্ক হয়ে উঠছে, ফলে বনাঞ্চলে আগুন লাগার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বছরও একই অঞ্চলে একটি বড় দাবানল দেখা গিয়েছিল, যেখানে প্রায় ২,৬০০ হেক্টর এলাকা পুড়ে যায়। আর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালে হোক্কাইডো-এর কুশিরো এলাকায় প্রায় ২,৭০০ হেক্টর বনভূমি আগুনে ধ্বংস হয়েছিল—যা এখনো জাপানের অন্যতম বড় দাবানল হিসেবে বিবেচিত।
পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে। দাবানল, খরা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলছে।
এই ঘটনার পর জাপান সরকার বন ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি আরও জোরদার করার পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ১১ দিনের এই কঠিন লড়াই শেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও এটি জাপানের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে দেশটি।