
খুলনা নগরীতে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় একটি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া ২ নম্বর ক্রস রোড এলাকার একটি বাড়ির নারকেল গাছ থেকে প্রাণীটি নিচে পড়ে গেলে সেটিকে উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দা লাভলি বেগম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রাণীটি গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার পর একটি বিড়াল সেটির ওপর আক্রমণের চেষ্টা করে। বিষয়টি দেখতে পেয়ে দ্রুত প্রাণীটিকে উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে যান লাভলি বেগম। বর্তমানে প্রাণীটি তার তত্ত্বাবধানে রয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও খাবার খাচ্ছে।
উদ্ধারকারী পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রাণীটিকে পানি, ভাত, আম, কাঁঠাল ও কলাসহ বিভিন্ন খাবার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাণীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুলনার বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা প্রাণীটি পর্যবেক্ষণের পর এর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করবেন।
প্রাণীটির পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে সুগার গ্লাইডার বলে ধারণা করছেন, আবার কেউ বলছেন এটি গন্ধগোকুল বা এশিয়ান পাম সিভেট হতে পারে। চেহারাগত কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি পর্যবেক্ষণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
গন্ধগোকুল বা Asian Palm Civet দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিচিত একটি নিশাচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। দেখতে বিড়ালের মতো হলেও এটি বিড়াল পরিবারের সদস্য নয়। শরীর থেকে বিশেষ ধরনের সুগন্ধ বের হওয়ার কারণে এটি বিভিন্ন এলাকায় গাছখাটাশ, তালখাটাশ, পোলাও প্রাণী কিংবা গন্ধগোকুল নামে পরিচিত।
অন্যদিকে Sugar Glider মূলত অস্ট্রেলিয়া, নিউগিনি ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে পাওয়া যায়। এদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সামনের ও পেছনের পায়ের মাঝখানে থাকা পাতলা চামড়ার পর্দা, যার সাহায্যে তারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে ভেসে যেতে পারে। নিশাচর স্বভাবের এই প্রাণীগুলো সাধারণত দলে বসবাস করে এবং বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্ধার হওয়া প্রাণীটির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণে শারীরিক গঠন, লেজ, দাঁত, চোখ এবং চলাফেরার ধরন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সঠিক শনাক্তকরণের পর প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানিয়েছেন, প্রাণীটি গন্ধগোকুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরাসরি পর্যবেক্ষণের পরই চূড়ান্তভাবে বলা যাবে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্রাণী বর্তমানে এ অঞ্চলে খুব কম দেখা যায় এবং প্রায় বিলুপ্তপ্রায় অবস্থায় রয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণ, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণে অনেক বিরল প্রাণী এখন মানুষের বসত এলাকায় চলে আসছে। তাই এমন প্রাণী পাওয়া গেলে সেটিকে ক্ষতি না করে দ্রুত বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা উচিত। এতে প্রাণীটির সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।