
দীর্ঘদিন ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনার পর নিজস্ব সদর দপ্তরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই নতুন ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল সদৃশ চিহ্ন দেখা যাওয়ায় পুরো প্রকল্পটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান এলাকার জয় পাহাড়ে নির্মিত এই পাঁচতলা স্টিল স্ট্রাকচার ভবনটির নির্মাণ ব্যয় ৫০ কোটিরও বেশি টাকা। প্রায় সব ধরনের কাজ শেষ করে খুব শিগগিরই ভবনটি চালুর প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক এমন সময় দেয়াল ও বিভিন্ন সংযোগস্থলে দৃশ্যমান ফাঁক ও চিড় চোখে পড়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে ভবনটি পরিদর্শনের চেষ্টা করা হলেও প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। বাইরে থেকে ধারণ করা ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ভবনের কিছু অংশে পুনরায় প্লাস্টার ও রংয়ের কাজ চলছে।
নির্মাণকাজে যুক্ত কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেয়ালের কিছু জায়গায় ফাঁক ও চিড় দেখা যাওয়ায় সেগুলো মেরামতের কাজ করা হচ্ছে। তবে এই সমস্যাগুলো ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
অন্যদিকে বিপিসির কিছু কর্মকর্তাও বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে তদারকি ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে বিপিসির পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি কোনো কাঠামোগত ফাটল নয়। উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মো. আপেল মামুন জানান, স্টিল স্ট্রাকচারের ভবনে কাঠামোগত ফাটল হওয়ার সুযোগ নেই। স্টিল ও কংক্রিটের সংযোগস্থলে প্লাস্টারের কিছু গ্যাপ তৈরি হয়েছিল, যা পুটিংয়ের মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছে।
এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এমন ত্রুটি কেন দেখা গেল, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় চট্টগ্রামে বিপিসির নিজস্ব সদর দপ্তর নির্মাণ ছিল দীর্ঘদিনের দাবি। স্বাধীনতার পর ঢাকায় সদর দপ্তর থাকলেও ১৯৯০ সালে তা চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি।
নিজস্ব জমি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে বহু বছর ধরে সদর দপ্তর নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। অবশেষে জয় পাহাড় এলাকায় নিজস্ব অর্থায়নে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এর দায়িত্ব পায় United Corporation।
তবে প্রকল্পটি শুরু থেকেই বিতর্কের বাইরে ছিল না। ভবন নির্মাণের সময় পাহাড় কাটার অভিযোগ ওঠে। পরে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তর বিপিসিকে জরিমানা করে। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও পরিবেশগত দিক নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য বিপিসির এই সদর দপ্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর নির্মাণমান নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে তা দ্রুত কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। এতে জনমনে থাকা সংশয় দূর হবে এবং প্রকল্পের গুণগত মান সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে, উদ্বোধনের আগেই বিপিসির নতুন ভবনে ফাটল সদৃশ চিহ্ন দেখা যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি নির্মাণ ত্রুটি নয়, বরং এটি বৃহত্তরভাবে প্রকল্প তদারকি, গুণগত মান এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।