
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গড়ুরার মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘিরে এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক ও আলোচনার ঢেউ। মাত্র ১০ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জুনায়েদ এখন পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছে।
জুনায়েদের বাবা হাবিবুর রহমান গত মার্চ মাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারে চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা জমানো ছিল। কিন্তু সেই জমানো টাকা নিয়ে তিন সন্তানকে ফেলে অন্য এক যুবকের সঙ্গে চলে যান জুনায়েদের মা রোজিনা খাতুন। পরিবারের এই কঠিন সময়েই ভেঙে পড়ে সবকিছু।
মায়ের চলে যাওয়ার পর বাবার অসুস্থতা আরও বাড়তে থাকে। চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন হাবিবুর রহমান মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তখন থেকেই ছোট্ট জুনায়েদের জীবনে শুরু হয় এক কঠিন সংগ্রাম।
পরিবারে রয়েছে অসুস্থ দাদা-দাদি, ১২ বছর বয়সী বড় ভাই এবং ছোট এক বোন। বড় ভাইও শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র ১০ বছর বয়সেই বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় জুনায়েদ।
প্রতিদিন সকালে সে ভ্যান নিয়ে বের হয় এবং সারাদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যাত্রী পরিবহন করে। যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে পরিবারের খাবার, দাদা-দাদির চিকিৎসা এবং ছোট ভাইবোনের খরচ চালানো হয়। এর ফলে তার স্কুলজীবনও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র হলেও এখন আর নিয়মিত ক্লাসে যেতে পারে না।
জুনায়েদ জানায়, বাবার ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়েই পরিবারের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সে। মায়ের চলে যাওয়া এবং বাবার মৃত্যু তার জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে এসেছে। এখন তাদের দেখার মতো আর কেউ নেই বলেও জানায় সে।
স্থানীয়রা জানান, এত ছোট বয়সে একটি শিশুর এমন দায়িত্ব নেওয়া সত্যিই কষ্টকর এবং অবিশ্বাস্য। অনেকেই সহানুভূতি প্রকাশ করে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। একজন স্থানীয় কলেজ শিক্ষক বলেন, এই বয়সে যেখানে শিশুরা খেলাধুলা ও পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে জুনায়েদ জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছে।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, জুনায়েদ নিয়মিত স্কুলে আসছে না, তবে তাকে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তারা তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথাও ভাবছেন।
দাদিও কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ঈদের দিন যখন অন্য শিশুরা আনন্দ করছে, তখন জুনায়েদ পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ভ্যান চালাচ্ছিল। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি পুরো পরিবারের জন্যই অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, তারা দ্রুত পরিবারটির খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই ঘটনা শুধু একটি শিশুর কষ্টের গল্প নয়, বরং সমাজের বাস্তবতা, দারিদ্র্য এবং পারিবারিক ভাঙনের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে। ছোট্ট জুনায়েদের এই সংগ্রাম অনেকের হৃদয় নাড়া দিয়েছে এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনে দিয়েছে।