
এক হৃদয়বিদারক ও মানবিক ঘটনার সাক্ষী হলো রাজশাহীর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার। কারাবন্দি এক বাবাকে শেষবারের মতো তার মৃত সন্তানের মুখ দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়, যা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা দুলাল উদ্দিন বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি হিসেবে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে তিনি এই কারাগারে আছেন। তার ছেলে আব্দুল্লাহ সম্প্রতি এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার (২ এপ্রিল) রাতে, যখন ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে আব্দুল্লাহর মৃত্যু হয়। হঠাৎ এই মৃত্যুর সংবাদ পরিবারে গভীর শোকের ছায়া নেমে আনে।
ছেলের মৃত্যুর খবর কারাগারে থাকা বাবা দুলাল উদ্দিনের কাছে পৌঁছালে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এ অবস্থায় পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মানবিক আবেদন জানানো হয়—শেষবারের মতো যেন বাবা তার ছেলের মুখ দেখতে পারেন।
পরিবারের এই আবেদনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কারা কর্তৃপক্ষ। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স)-এর মৌখিক নির্দেশনায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিহত আব্দুল্লাহর মরদেহ কারাগারের প্রধান ফটকে আনা হয়। সেখানেই বন্দি দুলাল উদ্দিনকে নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তার সন্তানের নিথর দেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, মানবিক দিক বিবেচনায় এবং আইন ও নিরাপত্তা বজায় রেখেই এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি ছিল এক কঠিন ও আবেগঘন মুহূর্ত, যা কারা প্রাঙ্গণকে ভারী করে তোলে।
ছেলের নিথর দেহ দেখে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেননি দুলাল উদ্দিন। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং দীর্ঘক্ষণ শোকে মুহ্যমান থাকেন। উপস্থিত কারা কর্মকর্তারাও এই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
পরে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দশরশিয়া গ্রামে, যেখানে স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে আব্দুল্লাহকে দাফন করা হয়।
এই ঘটনাটি শুধু একটি পারিবারিক শোক নয়, বরং মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কঠোর আইন ও নিরাপত্তার মধ্যেও যে মানবিক অনুভূতির জায়গা রয়েছে, এই ঘটনা তা আবারও প্রমাণ করেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, এমন সিদ্ধান্তে একজন বাবাকে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলেও এক ধরনের মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনা একদিকে যেমন শোকের, অন্যদিকে মানবিকতারও প্রতিচ্ছবি। একজন কারাবন্দি বাবার শেষ দেখা, একটি সন্তানের শেষ বিদায়—সব মিলিয়ে হৃদয়বিদারক এক অধ্যায় হয়ে রইল রাজশাহীর এই কারাগারের ইতিহাসে।