
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া-এ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সামরিক বিমান দুর্ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর এল আল্টো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর কাছে সংঘটিত ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত ২২ জন। সাম্প্রতিক তদন্তের অগ্রগতিতে এই ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে বিমানের পাইলট ও কো-পাইলটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে একটি সি-১৩০ হারকিউলিস সামরিক কার্গো বিমানের মাধ্যমে। এই বিমানটি মূলত পরিবহন কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বহন করা হচ্ছিল। তদন্তে জানা গেছে, প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা বহন করছিল বিমানটি, যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছিল।
ঘটনার দিন বিমানের ফিউজেলাজের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সেটি বিমানবন্দরের বাইরে জনবহুল এলাকায় পড়ে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বহু মানুষ হতাহত হন। দুর্ঘটনার পরপরই আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই সেই টাকা সংগ্রহ করতে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে জনতাকে সরিয়ে দেয়।
পরে কর্তৃপক্ষ ওই ছড়িয়ে পড়া অর্থকে অবৈধ ঘোষণা করে। এতে বোঝা যায়, দুর্ঘটনার পর শুধু প্রাণহানিই নয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছিল।
তদন্তে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুতর ত্রুটি ও অবহেলার বিষয়। বলিভিয়ান বিমান বাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় বিমানটি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে পাইলট দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিমানের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। তবে সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বিপর্যয় ডেকে আনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবতরণের সময় পাইলট নোজ গিয়ার বা সামনের চাকার ওপর ভর দিয়ে নামার চেষ্টা করেন, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ব্রেকিং সিস্টেম সঠিকভাবে কাজ করেনি। এর পাশাপাশি রানওয়ের একটি অংশ ভেজা থাকায় বিমানের চাকা পিছলে যায় এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে বিমানটি।
তদন্ত বোর্ডের প্রধান কর্নেল রিচার্ড আলারকন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। তার মতে, সঠিক সিদ্ধান্ত ও প্রোটোকল মেনে চললে এত বড় প্রাণহানি ঘটত না।
এই ঘটনার পর প্রসিকিউটর ফ্যাভিও মালডোনাডো পাইলট ও কো-পাইলটের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ‘অনিচ্ছাকৃত হত্যার’ অভিযোগ আনা হয়েছে এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত জামিন স্থগিত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি মানবিক ভুল নয়, বরং এটি বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে সামরিক পরিবহন বিমানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রোটোকল আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কারণ, সামরিক বিমান ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা আবারও সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে, বলিভিয়ার এই মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা শুধু একটি দেশীয় ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্তের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।