
রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে বাংলাদেশ। দেশের সুস্বাদু ও জনপ্রিয় আমের জন্য এবার সম্ভাবনাময় নতুন বাজার হিসেবে উঠে এসেছে মালয়েশিয়া। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ফলে এই সম্ভাবনা এখন বাস্তবায়নের পথে।
২০২৩ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি আম রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। এ লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার কৃষি বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান করা হয়েছে এবং কীটপতঙ্গ ঝুঁকি বিশ্লেষণ বা পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিস (পিআরএ) রিপোর্টও প্রেরণ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি বিভাগ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে সম্ভাব্য আমদানিকারক, সুপারশপ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জানা গেছে, মালয়েশিয়ার বাজারে আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে সেখানে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর কারণে দেশের আমের প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ এবং হাইকমিশনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ, মালয়েশিয়ার কৃষি বিভাগ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে একটি যাচাইকরণ পরিদর্শনের প্রস্তাব দেয়। এই পরিদর্শন ‘ভেরিফিকেশন অব কমপ্লায়েন্স’ (ভিওসি) নামে পরিচিত, যা পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিস সম্পন্ন করার পূর্বশর্ত হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়ান সরকারের এই প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। জানা গেছে, মালয়েশিয়ার কৃষি বিভাগের দুই সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী ৭ থেকে ১৩ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করবে।
এই সফরের সময় তারা দেশের বিভিন্ন আম উৎপাদন এলাকা, প্যাকিং হাউস, সংরক্ষণ সুবিধা এবং রপ্তানির প্রস্তুতি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে তারা যাচাই করবেন, বাংলাদেশি আম আন্তর্জাতিক মান ও নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করতে সক্ষম কি না।
এই পুরো কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশাবাদী, সবকিছু ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হলে চলতি আম মৌসুমেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের তাজা আম রপ্তানি শুরু করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্ত হলে তা শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতে বাংলাদেশের আম রপ্তানির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর ফলে দেশের কৃষি খাত যেমন লাভবান হবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও আরও প্রসারিত হবে।
বাংলাদেশের আম ইতোমধ্যেই স্বাদ, গুণগত মান এবং বৈচিত্র্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি পাচ্ছে। এই নতুন উদ্যোগ সফল হলে দেশের আমচাষি, রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের আম রপ্তানির এই উদ্যোগ শুধু একটি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নয়, বরং এটি দেশের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।