
জাতীয় রাজনীতির অন্যতম বর্ষীয়ান নেতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদকে ভোলায় রাষ্ট্রীয় সম্মানে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন শেষে তিনি তার জন্মভূমি ভোলাতেই বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।
মঙ্গলবার (২ জুন) ভোলায় তার মরদেহ পৌঁছানোর পর পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। হাজার হাজার মানুষ শেষবারের মতো প্রিয় নেতাকে দেখতে ভিড় করেন এবং চোখের জলে বিদায় জানান। দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
জানাজার আগে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রীয় এই সম্মান জানানো হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদান এবং দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ।
জানাজার পর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে তাকে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেখানে তার বাবা-মা এবং স্ত্রীর কবরের পাশেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি পরিচিত নাম। ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন ও পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
তার রাজনৈতিক জীবন যেমন ছিল দীর্ঘ, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন মায়ের প্রতি গভীর অনুরাগী। স্মৃতিকথায় তিনি বারবার তার মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগের কথা উল্লেখ করেছেন। তার জীবনজুড়ে মা ছিলেন প্রেরণা, শক্তি ও নির্ভরতার প্রতীক।
জীবদ্দশায় তিনি লিখেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মাকে না দেখে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার শপথ নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে দেশে ফিরে প্রথমেই মায়ের কোলে ফিরে যান। সেই আবেগঘন স্মৃতি তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মতে, মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি মায়ের উপস্থিতি অনুভব করতেন। রাজনীতির ব্যস্ততা, কারাবরণ, আন্দোলন—সবকিছুর মাঝেও মা ছিলেন তার প্রধান আশ্রয়।
শেষ বিদায়ে উপস্থিত জনতা বলেন, তোফায়েল আহমেদ শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি ইতিহাসের অংশ। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার মৃত্যু সেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও তার অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শেষে বলা যায়, জীবনভর যিনি দেশ ও মাতৃভূমিকে ভালোবেসেছেন, তিনি শেষ আশ্রয়ও খুঁজে নিয়েছেন নিজের শেকড়ের কাছেই—মায়ের পাশে। ভোলার মাটি আজ তাই শুধু একজন নেতাকে নয়, একটি ইতিহাসকে চিরবিদায় জানিয়েছে।