
মার্চ মাসের শুরুতে হওয়া আকস্মিক বৃষ্টি ও বন্যায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাওর অঞ্চল কিশোরগঞ্জে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসল কাটার মাত্র কয়েক দিন আগে ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো কৃষকের বছরের প্রধান আয়ের উৎস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাওর অঞ্চলের কৃষকদের প্রত্যাশা ছিল এ মৌসুমে ভালো ফলনের মাধ্যমে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া। কিন্তু মৌসুমের শেষ সময়ে অকাল বন্যা তাদের সেই আশা ভেঙে দিয়েছে। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, তাদের ক্ষেতের অর্ধেকেরও বেশি ধান নষ্ট হয়ে গেছে। যেসব ধান পানির মধ্য থেকে কষ্ট করে কাটা হয়েছে, তারও বড় অংশ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় ৩৩ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল, যা থেকে প্রায় ২২ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে বন্যার কারণে প্রায় ২ লাখ টন চাল উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এটি মোট উৎপাদনের প্রায় ১ শতাংশ, তবুও বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষকরা পানিতে ভেজা ধান রাস্তা, বাড়ির উঠান ও খোলা স্থানে শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় অনেক ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ইটনার মধ্যগ্রামের কৃষক আবু সালেক জানান, তিনি ২৫ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। প্রায় ২ হাজার ৩০০ মণ ধান পাওয়ার আশা থাকলেও বন্যার কারণে মাত্র ৩৫০ মণ ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন। নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি ১২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন তিনি। এখন সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
একইভাবে পুরানহাটি গ্রামের কৃষক আবুল খায়ের জানান, পানিতে ডুবে যাওয়ায় যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি। শ্রমিক সংকট ও অতিরিক্ত মজুরির কারণে সাত একরের মধ্যে মাত্র দুই একরের ধান সংগ্রহ করতে পেরেছেন।
মিঠামইনের কৃষক আঙ্গুর মিয়া জানান, আট একরের মধ্যে মাত্র তিন একরের ধান তুলতে পেরেছেন। প্রায় ৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেও উৎপাদিত ধান বিক্রি করে সেই অর্থের অর্ধেকও ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন কৃষানী উজ্জ্বলা রানী বৈষ্ণব। তিনি ও তার পরিবার ১৮ একর জমিতে চাষ করে মাত্র ৬ একরের ফসল ঘরে তুলতে পেরেছেন।
ধান ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইটনার ব্যবসায়ী পারভেজ বেপারি বলেন, প্রতিবছর তিনি প্রায় ৩৫ হাজার মণ ধান কিনলেও এ বছর তার অর্ধেকও সংগ্রহ করা কঠিন হবে। অধিকাংশ ধানে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও দুর্গন্ধ থাকায় বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।
চালকল মালিক অমৃত বর্মনও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত ধান সংগ্রহ করা সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে বছরের শেষ দিকে এ অঞ্চলে ধানের ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং বাইরের অঞ্চল থেকে চাল আমদানি করতে হতে পারে।
কৃষক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল এবং কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় হাওরাঞ্চলের হাজারো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।