
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাতে অংশগ্রহণ না করার অবস্থান স্পষ্ট করেছে ফ্রান্স। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধে ফ্রান্স কোনোভাবেই যুক্ত হবে না।
শুক্রবার ফরাসি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এই সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই ফ্রান্স যুদ্ধে জড়ায়নি। আমরা আগেই বলেছি, যুদ্ধের লক্ষ্য পরিষ্কার নয় এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তাই এতে অংশ নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”
ফ্রান্স শুরু থেকেই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব পড়বে।”
বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় এর বন্ধ থাকা বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তিনি জানান, ওই অঞ্চলে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে একটি আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, “আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো ধরনের বাধা, ব্ল্যাকমেইল বা টোল আদায় গ্রহণযোগ্য নয়। সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।”
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। পরবর্তীতে এই সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলার ঘটনা ঘটে।
এতে গোটা অঞ্চল অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
প্রায় ৩৯ দিন ধরে চলা সংঘাতের পর দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত ৮ এপ্রিল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে পরবর্তীতে এর মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়।
এরই মধ্যে ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদ-এ শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা ব্যর্থ হয়। পরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান নতুন করে আলোচনা শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এককভাবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও এখনো পর্যন্ত ইরান দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসতে সম্মত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের এই অবস্থান ইউরোপীয় কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার যে নীতি ফ্রান্স তুলে ধরেছে, তা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক উদ্যোগে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ দেখা দিলেও ফ্রান্স স্পষ্টভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথেই থাকার বার্তা দিয়েছে।