
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন Donald Trump। এবার তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘জলদস্যুর মতো’ বলে বর্ণনা করে নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাহিনী একটি জাহাজ জব্দ করেছে এবং সেখান থেকে পণ্য ও তেল নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা জাহাজটি দখল করেছি, পণ্য নিয়েছি, তেল নিয়েছি—এটা খুবই লাভজনক ব্যবসা।” একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “আমরা যেন জলদস্যুর মতো, তবে আমরা কোনো খেলা খেলছি না।”
এই বক্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, কারণ সাধারণত রাষ্ট্রীয় সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে এমন ভাষা খুব কমই ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, Iran থেকে ছেড়ে আসা বা ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কিছু জাহাজ, বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও কনটেইনার জাহাজ, বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ তৈরির অংশ হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ Strait of Hormuz দিয়ে নিজেদের জাহাজ ছাড়া প্রায় সব ধরনের নৌযান চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো লক্ষ্য করে পৃথক নৌ অবরোধ আরোপ করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং কোনো স্থায়ী সমাধানের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি United States ও Israel যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়, যা সংঘাতকে একটি পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক সংকটে রূপ দেয়।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হওয়ায় এই রুটে যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধ নিয়ে সমর্থন ধীরে ধীরে কমে আসছে। অনেক নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল অবস্থান, কড়া ভাষা ব্যবহার এবং ইরানকে ঘিরে তার আক্রমণাত্মক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হতে পারে। এমন পদক্ষেপকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও বিবেচনা করা হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আদালতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সংলাপের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামরিক ও কৌশলগত চাপের পথ এখনো খোলা রয়েছে। এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দ্রুত সমাধানের পরিবর্তে আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।