
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ৬৩তম দিনে এসে আরও জটিল ও অস্থির পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এবং সীমিত সংঘর্ষের মধ্যেই পুরো অঞ্চল নতুন করে নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, দেশের বন্দর ও সামুদ্রিক পথ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কোনো সাধারণ কৌশল নয়, বরং এটি সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের অংশ। তিনি এই পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন, এতে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আরও ভেঙে পড়তে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে ওয়াশিংটন আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ইরান নিয়ে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বিস্তারিত খুব অল্প মানুষই জানেন। এই মন্তব্য নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে ড্রোন ও ছোট আকারের আক্রমণ ঠেকানো যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও চাপের কারণে ইরান এখন তুলনামূলকভাবে প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। দেশটি তেল মজুত, বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর করে ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছে। তবে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল মার্ক কিমিট মনে করেন, সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন। বরং এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থায় রূপ নিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে আলোচনার পথ খুলতে পারে বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ড্রোন হামলার খবরও পাওয়া গেছে। এতে করে সীমান্ত অঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
মানবিক সংকটও দিন দিন গভীর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের দাবি অনুযায়ী, সামরিক অভিযানে বেসামরিক প্রাণহানি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং প্রযুক্তিগতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হলেও মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়। তবে বাস্তবে নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ছে।
একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৫৪ জন শিশু রয়েছে। এই তথ্য পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের নাগরিকদের ইরান, লেবানন ও ইরাকে ভ্রমণ না করার নির্দেশ দিয়েছে এবং সেখানে অবস্থানরতদের দ্রুত দেশে ফিরতে বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের সংঘাত কমলেও বাস্তবে ছোট ছোট হামলা ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। তাই “যুদ্ধ শেষ” দাবি পুরোপুরি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
এই পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চার বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি এবং পরিবহন খরচ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক অচলাবস্থা, মানবিক সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কোনো সমাধান না হলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আকারে বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে।