
বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায়। সার সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের কারণে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলে, বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশে কৃষকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। থাইল্যান্ডের চাচোয়েংসাও প্রদেশের এক কৃষক জানান, সার না পাওয়ায় বা অতিরিক্ত দামে পাওয়ার কারণে তিনি এ মৌসুমে ধান চাষ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সরবরাহ চেইনের ভাঙন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে Strait of Hormuz-এর অস্থিরতা সার পরিবহনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।
এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের সার ও জ্বালানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। কিন্তু সংঘাতের কারণে সেখানে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সার সরবরাহ কমে গেছে এবং দাম বেড়ে গেছে।
বিশেষ করে নাইট্রোজেন সার ইউরিয়ার দাম এক মাসের ব্যবধানে ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ হঠাৎ বেড়ে গেছে, যা অনেককে চাষাবাদ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বড় সার উৎপাদনকারী দেশ China নিজস্ব নীতিগত কারণে রপ্তানি সীমিত করেছে। দেশটি খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়।
চীনের নতুন নীতির ফলে সার রপ্তানি ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভিয়েতনাম বিশ্বের অন্যতম বড় চাল রপ্তানিকারক হলেও তাদের সারের বড় অংশই আসে চীন থেকে। একইভাবে ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডও ব্যাপকভাবে আমদানি নির্ভর।
এই নির্ভরতার ফলে একটি “ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য চেইন” তৈরি হয়েছে, যেখানে এক দেশের সংকট অন্য দেশের খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে, চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ না নিলে এই সংকট খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ, বাণিজ্য বাধা এবং সরবরাহ চেইনের ভাঙন একসঙ্গে মিলে এশিয়ার খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।