
পিরিয়ডস বা মাসিকের আগে অনেক নারীর মুখে হঠাৎ করে ব্রণ দেখা যায়, যা বেশ অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর হতে পারে। অনেকেই ভাবেন এটি হয়তো ত্বকের যত্নের অভাব বা বাহ্যিক কোনো কারণে হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে শরীরের ভেতরের হরমোনগত পরিবর্তনে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পিরিয়ডসের ঠিক আগে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ কমে যায় এবং অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনের ফলে ত্বকের নিচে থাকা সেবেসিয়াস গ্রন্থি বা তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থিগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে ত্বকে অতিরিক্ত সিবাম বা তেল তৈরি হয়।
এই অতিরিক্ত তেল যখন ত্বকের মৃত কোষ এবং ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা লোমকূপ বন্ধ করে দেয়। এর ফলেই তৈরি হয় ব্রণ, হোয়াইটহেডস কিংবা অনেক সময় ব্যথাযুক্ত সিস্টিক অ্যাকনে। এই ধরনের ব্রণ সাধারণত পিরিয়ডের কয়েকদিন আগে বেশি দেখা যায় এবং মাসিক শুরু হলে ধীরে ধীরে কমে যায়।
এই ব্রণের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নও রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি মুখের নিচের অংশে, বিশেষ করে থুতনি, চোয়ালের রেখা এবং গালের চারপাশে বেশি হয়। কারও ক্ষেত্রে এটি হালকা হলেও, অনেকের ক্ষেত্রে তা লালচে, ফোলা এবং বেশ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে।
তবে শুধু হরমোন নয়, আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসও এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যেমন—অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা ত্বকের তেল উৎপাদন ও প্রদাহ বাড়ায়। একইভাবে, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং শরীরে পানির অভাব থাকলে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
খাদ্যাভ্যাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত মিষ্টি, তেলযুক্ত খাবার বা ফাস্টফুড খাওয়ার অভ্যাস থাকলে পিরিয়ডের আগে ব্রণের সমস্যা আরও বাড়তে পারে। এছাড়া অনেকেই এই সময়ে ত্বকে বেশি স্ক্রাব বা কড়া কেমিক্যাল ব্যবহার করেন, যা ত্বকের সুরক্ষা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ব্রণকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে লাইফস্টাইলে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রথমত, মাইল্ড ফেসওয়াশ ব্যবহার করা এবং নন-কমেডোজেনিক স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট বেছে নেওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, খাদ্যতালিকায় স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার রাখা এবং চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া প্রয়োজন।
এছাড়া দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা এবং প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মানসিক চাপ কমাতে যোগব্যায়াম বা মেডিটেশনও কার্যকর হতে পারে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে এই ব্রণ বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিতও দিতে পারে। যদি ব্রণের সঙ্গে অনিয়মিত পিরিয়ড, মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা চুল পড়ার মতো সমস্যা দেখা যায়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এগুলো পিসিওএস, থাইরয়েড সমস্যা বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, পিরিয়ডের আগে ব্রণ হওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বরং নিজের শরীরের পরিবর্তনগুলো বুঝে সঠিক যত্ন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করলে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।