
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চিকিৎসা বিজ্ঞানে একের পর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় এসেছে এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি, যার নাম ‘স্টার’ (STAR – Sperm Tracking and Recovery)। এই প্রযুক্তি অত্যন্ত অল্প বা লুকানো শুক্রাণু শনাক্ত করতে সক্ষম, যা আগে প্রচলিত পদ্ধতিতে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য পুরুষ ‘আজোস্পার্মিয়া’ নামক সমস্যায় ভোগেন। এই অবস্থায় তাদের বীর্যে খুব কম বা একেবারেই শুক্রাণু থাকে না। ফলে স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্ধ্যাত্বের প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা যায়। এতদিন এই রোগে আক্রান্ত দম্পতিদের জন্য চিকিৎসা সীমিত ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সন্তান নেওয়ার আশা প্রায় শেষ হয়ে যেত।
এই পরিস্থিতিতেই যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ‘স্টার’ প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। এটি অত্যাধুনিক ইমেজ প্রসেসিং এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে নমুনার মধ্যে থাকা অতি ক্ষুদ্র ও বিরল শুক্রাণু শনাক্ত করতে পারে। প্রতি সেকেন্ডে শত শত ছবি বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি সম্ভাব্য শুক্রাণু চিহ্নিত করে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা আলাদা করে সংগ্রহ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে একজন মানুষের ল্যাব টেকনিশিয়ান দীর্ঘ সময় ধরে নমুনা পর্যবেক্ষণ করেও অনেক সময় শুক্রাণু খুঁজে পান না, সেখানে ‘স্টার’ প্রযুক্তি মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে বিশ্লেষণ সম্পন্ন করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি কিছু ক্ষেত্রে ৪০ গুণ বেশি কার্যকরভাবে শুক্রাণু শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
এই প্রযুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য সফল প্রয়োগ দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির এক দম্পতির ক্ষেত্রে। দীর্ঘ আড়াই বছর সন্তান ধারণের চেষ্টা করার পর তারা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসা নেন। দম্পতির স্বামীর জিনগত সমস্যা ছিল ‘ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম’, যেখানে শরীরে অতিরিক্ত এক্স ক্রোমোজোম থাকার কারণে শুক্রাণু উৎপাদন অত্যন্ত কম হয়। ‘স্টার’ প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত শুক্রাণুর মাধ্যমে পরে স্ত্রী সফলভাবে গর্ভধারণ করেন।
২০২৫ সালের শেষ দিকে এই পদ্ধতিতে প্রথম সফল সন্তানের জন্ম হয় বলে জানা গেছে। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে আরও অনেক দম্পতি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য আগ্রহী হচ্ছেন। এটি বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে গবেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল, নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা আরও যাচাই করা প্রয়োজন। যদিও প্রাথমিক ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, তবুও চিকিৎসা ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রয়োগের আগে আরও বিস্তৃত গবেষণা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত ও সহজ করতে পারে। যেসব দম্পতির কাছে আগে সন্তান ধারণের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না, তাদের জন্য এটি এক নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, মানবজীবনের আবেগ ও স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রেও একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।