
প্রতিদিন আমরা কতটা হাঁটি—এই প্রশ্নটি আমাদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেকেই দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন, ফলে হাঁটার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের দৈনিক হাঁটার গড় এবং এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাঁটার পরিমাণ কমতে থাকে। ১৮ বছরের নিচে শিশু-কিশোররা সাধারণত প্রতিদিন ১০,০০০ থেকে ১৬,০০০ কদম পর্যন্ত হাঁটে। তাদের জীবনযাত্রা বেশি সক্রিয় হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই হাঁটার পরিমাণ বেশি থাকে।
অন্যদিকে, ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে ৪,০০০ থেকে ১৮,০০০ কদম পর্যন্ত হাঁটতে পারেন। তবে বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষের দৈনিক হাঁটার পরিমাণ মাঝামাঝি পর্যায়েই থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা প্রতিদিন গড়ে ৫,৩৪০ কদম এবং নারীরা ৪,৯১২ কদম হাঁটেন।
লিঙ্গভেদেও হাঁটার পরিমাণে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত পুরুষরা সাধারণত নারীদের তুলনায় বেশি হাঁটেন। এর পেছনে জীবনযাত্রা, কাজের ধরন এবং শারীরিক কার্যকলাপের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পেশাও মানুষের হাঁটার পরিমাণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। একটি অস্ট্রেলীয় গবেষণায় বিভিন্ন পেশার মানুষের হাঁটার গড় হিসাব পাওয়া গেছে। যেমন—ওয়েটাররা প্রতিদিন গড়ে ২২,৭৭৮ কদম হাঁটেন, যা তালিকার শীর্ষে। নার্সদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রায় ১৬,৩৯০ কদম। খুচরা বিক্রেতারা হাঁটেন প্রায় ১৪,৬৬০ কদম এবং শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তা ১২,৫৬৪ কদম।
অন্যদিকে, যেসব পেশায় দীর্ঘ সময় বসে কাজ করতে হয়, সেখানে হাঁটার পরিমাণ তুলনামূলক কম। অফিস কর্মীরা প্রতিদিন গড়ে ৭,৫৭০ কদম হাঁটেন, আর কল সেন্টার কর্মীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬,৬১৮ কদম। এ থেকে বোঝা যায়, কাজের ধরন আমাদের দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
বিশ্বজুড়েও হাঁটার পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হংকংয়ের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৬,৮৮০ কদম হাঁটেন, যা তালিকার শীর্ষে। চীনে এই সংখ্যা ৬,১৮৯ কদম, যুক্তরাজ্যে ৫,৪৪৪ কদম, ভারতে ৪,২৯৭ কদম এবং ইন্দোনেশিয়ায় মাত্র ৩,৫১৩ কদম। জলবায়ু, নগর পরিকল্পনা, রাস্তার অবস্থা এবং মানুষের আয়—এসব বিষয় এই পার্থক্যের জন্য দায়ী।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত প্রতিদিন ১০,০০০ কদম হাঁটার লক্ষ্য নির্ধারণকে আদর্শ বলে মনে করেন। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং মানসিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
Centers for Disease Control and Prevention (CDC)-এর মতে, সুস্থ থাকতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটা প্রয়োজন। এটি দৈনিক গড়ে প্রায় ২,০০০ কদম দ্রুত হাঁটার সমান। তবে দৈনন্দিন অন্যান্য কাজ মিলিয়ে ১০,০০০ কদম পূরণ করা সবচেয়ে উপকারী বলে বিবেচিত হয়।
প্রতিদিন হাঁটার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। যেমন—লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করা, গাড়ি কিছুটা দূরে পার্ক করে হাঁটা, বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সময় কাটানো, ঘরের কাজ নিজে করা এবং কাজের ফাঁকে ছোট ছোট হাঁটা।
সবশেষে বলা যায়, হাঁটা একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ব্যায়াম। প্রতিদিনের ছোট ছোট পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই সুস্থ জীবনযাপনের জন্য হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।