
ঈদের আনন্দ শেষ না হতেই চট্টগ্রাম নগরে চামড়া ব্যবসাকে ঘিরে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সংকট। নগরের আতুরার ডিপো, আগ্রাবাদ চৌমুহনীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় পড়ে আছে হাজার হাজার কাঁচা চামড়া। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশায় পড়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক জায়গায় চামড়া ফেলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
ঈদুল আজহার সময় সাধারণত কোরবানির পশুর চামড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। চট্টগ্রামে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে, ধারদেনা করে বা নিজের শেষ সম্বল বিনিয়োগ করে চামড়া কিনলেও বাজারে গিয়ে প্রত্যাশিত দাম পাননি।
অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, চামড়ার বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। আড়তদাররা চামড়া কিনতে অনাগ্রহ দেখান এবং অনেক ক্ষেত্রে খুবই কম দামে কিনতে বাধ্য করেন ব্যবসায়ীদের।
একজন ব্যবসায়ী জানান, তিনি ৪০টি চামড়া প্রতিটি গড়ে ৩৫০ টাকা করে কিনলেও আড়তে এসে ১৫০ টাকার বেশি দাম পাননি। এতে প্রতিটি চামড়ায় বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। গাড়িভাড়া ও শ্রম খরচও উঠছে না বলে তিনি জানান।
আরেক ব্যবসায়ী প্রায় ২০০টি চামড়া সংগ্রহ করেও মাত্র ২০০ টাকার ফ্ল্যাট দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বাজারে চাহিদা কম এবং আড়তদাররা একসঙ্গে কম দাম ঘোষণা করছেন, ফলে বাধ্য হয়েই লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মোহাম্মদ আলাল নামের এক ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে। তিনি প্রায় ৬০০টির বেশি চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন, প্রতিটির গড় দাম ছিল সাড়ে ৩০০ টাকা। কিন্তু বাজারে গিয়ে তিনি কোনো ক্রেতা পাননি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে চামড়া ফেলে চলে আসেন বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি সভাপতি জানান, চামড়া প্রসেসিং, লবণ, শ্রম ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতি চামড়ায় অতিরিক্ত ব্যয় পড়ে। পাশাপাশি ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সময়মতো অর্থ না পাওয়াও এই সংকটের একটি বড় কারণ।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন যে বাজারে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। চাহিদা কমিয়ে দিয়ে কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের।
সরকারিভাবে ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বাস্তবে ছোট ও মাঝারি চামড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকায় এবং বড় চামড়া সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই কেনা দামের অর্ধেক।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, রাস্তায় পড়ে থাকা চামড়া দ্রুত অপসারণে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকশো চামড়া সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা এবং সিন্ডিকেট অভিযোগ—সব মিলিয়ে চামড়া খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মূলত ছোট ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
সব মিলিয়ে ঈদের পর চট্টগ্রামের চামড়া বাজার এখন অনিশ্চয়তা ও ক্ষতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই খাতটি আরও বড় সংকটে পড়বে।